ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় টানা মৃদু তাপপ্রবাহের কারণে দমবন্ধ গরমের পর এলো স্বস্তির বৃষ্টি। সঙ্গে ছিল কালবৈশাখীর তীব্র দাপট আর বজ্রপাত। গতকাল বুধবার সাহরির পর যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছিল তখনই হঠাৎ করে ঘনকালো মেঘে ঢাকা পরে ঢাকার আকাশ। কিছুক্ষণ পরেই ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় বজ্রপাত আর শিলাবৃষ্টি। সকালের এই কালবৈশাখীতে ঢাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও দেশের অনেক জায়গায়ই ঝড়ে গাছ পড়ে ও বজ্রপাতে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সন্দ্বীপে ঝড়ের কবলে পড়ে স্পিডবোট ডুবে নিহত হয়েছে এক শিশু। ওই ঘটনায় আরও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশের নৌপথগুলোতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বন্ধ ছিল নৌযান চলাচল।
এদিকে গতকাল আবহাওয়া অফিস পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার এক পূর্বাভাসে বলেছে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টিও হতে পারে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার পর থেকে ঢাকায় ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি। চলে প্রায় ৮টা পর্যন্ত। আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, এই সময়ে রাজধানীতে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ের সময় নগরীর বিমানবন্দর এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও বছিলা এলাকায়ও ঝড়ে তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। তবে দুই-এক এলাকায় গাছ পড়া ও দুয়েকটি জায়গায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া সকালের কালবৈশাখী ঝড়ে ঢাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পায়নি ফায়ার সার্ভিস। আর খুব সকাল হওয়ায় জলাবদ্ধতা ও যানজটের কবলেও পড়তে হয়নি নগরবাসীকে।
গতকাল শুধু ঢাকায় নয়, কালবৈশাখীর দাপট ছিল দেশের অনেক জেলাতেই। রাত সাড়ে ৩টার দিকে রংপুরে কালবৈশাখী ও বজ্রঝড় হয়। সেখানে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭৮ কিলোমিটার। ঝড় হয়েছে বগুড়া, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, মানিকগঞ্জ, বরিশাল ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও।
সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে স্পিডবোট ডুবে নুসরাত জাহান আনিকা (১২) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত শিশুর দুই যমজ বোন ইসরাত জাহান আদিফা (৮) ও ইসমত জাহান আলিফা (৮) এবং মো. সৈকত (৯) নামে অপর এক শিশু নিখোঁজ রয়েছে। বাকি ১৯ জন যাত্রী সাঁতরে কূলে পৌঁছেছেন।
ঘাট কর্র্তৃপক্ষ, ডুবে যাওয়া বোটের যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় ২২ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট কুমিরা ঘাট থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সন্দ্বীপের কূলের কাছাকাছি আসার পর তারা কালবৈশাখী ঝড়ের মুখোমুখি হয়। সাগরে ভাটা থাকায় বোট ঘাটের দক্ষিণ পাশে চলে যায়। কূলের প্রায় ২০০ গজের কাছাকাছি জেলেদের বসানো বিহন্দি জালের দড়ির সঙ্গে বোটের পাখা আটকে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় প্রচ- ঢেউয়ের তোড়ে বোটটি উল্টে যায়।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট খীসা সন্ধ্যা ৭টায় বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান বন্ধ করা হয়েছে। নিখোঁজ তিনজনকে এখনো পাওয়া যায়নি। আগামীকাল (আজ) সকালে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।’
বোটডুবিতে মারা যাওয়া আনিকার মা পান্না বেগম জানান, ‘স্পিডবোটভর্তি যাত্রী ছিল। আমার তিন মেয়ে আমার সঙ্গে ছিল। আমি সাঁতরে কোনোমতে কূলে উঠতে পারলেও ঢেউয়ের কারণে মেয়েগুলোকে সঙ্গে আনতে পারিনি।’
নিহত শিশু নুসরাত জাহান আনিকার বাড়িতে (মগধরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড, বড় ছাইয়ার বাড়ি) গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে চলছে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের কান্নার রোল। তিন কন্যাকে হারিয়ে অজ্ঞানপ্রায় মা পান্না বেগম।
আনিকার মামা ওসমান গনি বলেন, আমার দুলাভাই চার দিন আগে ওমান গেছেন। দুলাভাইকে বিদায় দিতে এসেছিল আমার বোন ও ভাগ্নিরা। আজ সকালে আমাদের বহদ্দারহাট বাসা থেকে আমাদের আত্মীয় সৈকতের (বোটডুবিতে নিখোঁজ আরেক শিশু) বাবা মো. সমিরের সঙ্গে ঘাটের দিকে রওনা দিয়েছিল।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বছরের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ে এক নারী নিহত হয়েছেন। নিহত রিনা আক্তার (৪০) উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের উত্তর কাঞ্চন নগর জড়ঝরি এলাকার মোহাম্মদ শাহ আলমের স্ত্রী। তার ২ ছেলে ও ১ কন্যাসন্তান রয়েছে।
মুরাদনগরে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক যাত্রী নিহত হয়েছেন। নিহত শিশু মিয়া (৬০) উপজেলার পূর্বধইর পূর্ব ইউনিয়নের খোশঘর গ্রামের মৃত নায়েব আলীর ছেলে। এ সময় অটোরিকশা চালক ও এক শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৭টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানাধীন শ্রীকাইল ইউনিয়নের সলফা গ্রামের রামচন্দ্রপুর-শ্রীকাইল সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে গাছ ভেঙে ঘরের নিচে চাপা পড়ে শ্বশুর ও পুত্রবধূর মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন রুস্তুম হাওলাদার (৭০) ও তার পুত্রবধূ জয়নব বেগম (৩৫)। এ ঘটনায় নিহত জয়নবের স্বামীসহ তিন সন্তান আহত হয়েছে। বুধবার বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার আলিমাবাদ ইউনিয়নের গাগুরিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ে বগুড়ায় গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে রেজাউল হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। এছাড়া ঝড়ে বোরো ধান, আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বগুড়া জেলার ওপর দিয়ে মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যাওয়া রেজাউল হোসেন নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটগ্রামের মৃত এছার উদ্দিনের ছেলে।
ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে আধা-পাকা বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নন্দীগ্রাম উপজেলায়। এই উপজেলায় পাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সেই সঙ্গে আম ও লিচুর গুঁটি ঝরে পড়েছে। নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আদনান বাবু বলেন, বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের কারণে কিছু জমিতে বোরো ধান নুয়ে পড়েছে।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় বজ্রপাতে ফিরোজা বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ৬টার দিকে উপজেলার খলসী ইউনিয়নের রৌহা গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ফিরোজা রৌহা গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী। তিনি তিন সন্তানের জননী ছিলেন।
খলসী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিয়াউল হক বলেন, ফিরোজা সকাল ৬টার দিকে বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পাড় রৌহায় ভুট্টা খেতে কাজ করছিলেন। ওই সময় তার ওপর বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে বাড়িতে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে ঝড়ের কারণে গতকাল সকালে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি নৌপথে প্রায় দেড় ঘণ্টা বন্ধ ছিল ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল। এতে সংশ্লিষ্ট ঘাটে পড়ে যানবাহনের বাড়তি চাপ। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পারাপারও স্বাভাবিক হতে শুরু করে।