দোকান খুলতে চান ব্যবসায়ীরা ছাত্রদের ১০ দাবি

ঢাকা কলেজ ও নিউমার্কেট এলাকায় গতকাল বুধবারও উত্তেজনা ছিল। সকাল ও দুপুরে বৃষ্টির কারণে ছাত্র ও দোকানিদের মধ্যকার উত্তেজনায় কিছুটা ভাটা পড়ে। সকালে হয়নি শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত মানববন্ধনও। একপর্যায়ে ঢাকা কলেজের সামনের মিরপুর সড়কে চলতে শুরু করে যানবাহন। কয়েকটি মার্কেটের দোকানও খোলেন ব্যবসায়ীরা। দুপুর ১টার দিকে নীলক্ষেত মোড়ে মানববন্ধন করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াসহ চার দফা দাবি জানান। পরে বিকেল ৪টার দিকে নিউমার্কেট খুলে দেওয়া হয়েছে এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে আবারও সড়কে নেমে আসেন ছাত্ররা। আবারও মুখোমুখি অবস্থান নেয় দুপক্ষ। ফের বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। ওই এলাকায় মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। সে সময় ঢাকা কলেজের সামনে বেশ কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। ইফতারির আগমুহূর্তে সড়ক ছেড়ে কলেজের ভেতরে ঢুকে যান ছাত্ররা। ব্যবসায়ীরাও সড়ক ছেড়ে দোকানের সামনে অবস্থান নেন। স্বাভাবিক হয় সড়কের যান চলাচল। পরে রাত ১১টার দিকে ১০ দফা দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। সংবাদ সম্মেলন শেষে রাত ১২টার পর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) সমঝোতা বৈঠকে যায় শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল।

এ বৈঠকে ব্যবসায়ীদের চারজন প্রতিনিধি এবং স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের শিক্ষকরাও ছিলেন। রাত ১টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল।

গত সোমবার রাতে নিউমার্কেটে দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে পরদিন মঙ্গলবার দিনভর দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা হয়। এতে মারা যান একজন। আহত হন পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ শতাধিক।

গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে কাউকে দেখা যায়নি। কলেজের সামনের মার্কেটগুলো বন্ধ থাকলেও প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টার, গ্লোব শপিং সেন্টারসহ বেশ কিছু মার্কেটের দোকান খুলতে দেখা যায়। তবে এ সময় কোনো ক্রেতা দেখা যায়নি।

গাউছিয়া মার্কেটের সামনে দোকান খোলার অপেক্ষায় থাকা মো. সুমন দেশ রূপান্তরকে জানান, চারতলায় জারিন ফ্যাশন নামে তার একটি কাপড়ের দোকান আছে। গত দুদিনে অন্তত ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে তার। কর্মচারীদের কয়েকজনকে ছুটি দিয়ে নিজে এসেছেন দোকান খোলার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমরা যেকোনো মূল্যে দোকান খুলতে চাই। মার্কেট কমিটির নির্দেশের অপেক্ষায় আছি আমরা।’

দুপুর ১টার দিকে নীলক্ষেত মোড়ে মানববন্ধন করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সেখানে সাত কলেজ থেকে একজন করে প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধন থেকে সাত কলেজের পক্ষে চার দফা দাবি ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়ক ইসমাইল সম্রাট। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংঘর্ষে উসকানিদাতা এডিসি হারুনকে অপসারণ করতে হবে। হল এবং ক্যাম্পাস বন্ধ করা যাবে না।

বিকেলে ককটেল বিস্ফোরণ : গতকাল বিকেলে নিউমার্কেট খুলে দেওয়া হয়েছে এমন খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা কলেজের ফটকের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন ছাত্ররা। পরে তারা নিউমার্কেট খোলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করেন। একই সময়ে নিউমার্কেটের সামনে ও আশপাশ এলাকায় ব্যবসায়ী-কর্মচারীরা অবস্থান নেন। ফলে ওই এলাকায় ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে একাধারে ১০-১২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। দুটি বিস্ফোরণ ঘটে কলেজের সামনে সড়কের ওপর। এ বিস্ফোরণ কারা ঘটিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিস্ফোরণের সময় ঢাকা কলেজের ফটকের সামনে জড়ো হওয়া শতাধিক ছাত্রদের হাততালি দিতে দেখা গেছে।

ওই এলাকায় কর্তব্যরত পুলিশ পরিদর্শক গিয়াস উদ্দীন বলেন, ‘কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পেয়েছি। যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।’

পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা : সংঘর্ষের সময় পুলিশের আচরণে ক্ষুব্ধ কলেজের শিক্ষকরা। তারা বলছেন, পুলিশ কলেজের ভেতরে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছে। গতকাল দুপুরে কলেজে জরুরি সভা ডাকেন অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) এটিএম মইনুল হোসেন। সভায় উপস্থিত শিক্ষকরা কলেজে হামলার অভিযোগে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষকে মামলা করা পরামর্শ দেন। অধ্যক্ষ সভায় জানিয়েছেন, মামলার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাদা পতাকা তুললেন ব্যবসায়ীরা : নিউমার্কেট এলাকার বিপণিবিতানগুলোর ছাদে এখন উড়ছে সাদা পতাকা। এর মাধ্যমে ‘আর সংঘর্ষ নয়, শান্তি চাই’ এ বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দোকানিরা। গতকাল সকালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর ওই এলাকায় বিভিন্ন বিপণিবিতানের ছাদে সাদা পতাকা উড়তে দেখা যায়।

তৃতীয়পক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা : তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এত বড় সংঘর্ষের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো তৃতীয়পক্ষ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। গতকাল দুপুরে নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংঘর্ষের ঘটনায় নিজেদের অবস্থান জানায় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সংঘর্ষের সময় অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাটিও অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। আমি মনে করি, কোনো ব্যবসায়ী বা ছাত্র এ কাজ করতে পারে না। এ ঘটনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান, এখানে তৃতীয়পক্ষ জড়িত।’

নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেছেন, ‘তিন দিনে নিউমার্কেট এলাকার ১০ হাজার ব্যবসায়ীর প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আমরা দোকান খুলতে চাই।’

হত্যা মামলা দায়ের : দুপক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নাহিদ নামে এক যুবক নিহতের ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১২টায় ডিএমপির রমনা বিভাগের নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নাহিদের বাবা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে।’

নিউমার্কেট জোনের এডিসি শাহেন শাহ্ বলেন, ‘আমাদের পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাই আমরাও মামলা করার কথা ভাবছি।’ নাহিদ কোন পক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটি নিশ্চিত হতে আমরা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ ও তা পর্যবেক্ষণ করছি। যে পক্ষই দায়ী থাক, সেই পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ছাত্রদের ১০ দফা : গতকাল রাত ১১টায় ঢাকা কলেজের শহীদ আ. ন. ম. নজীব উদ্দিন খান খুররম অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি ও নিউমার্কেট থানার ওসির প্রত্যাহারসহ ১০ দফা দাবি জানিয়েছেন ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। শিক্ষার্থীদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন কথা বলেন ঢাকা কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী সুজয় বালা ও মাসুম বিল্লাহ।

দাবিগুলো হলো ১. ন্যক্কারজনক হামলার উসকানিদাতা, ইন্ধনদাতা ও হামলাকারীদের তদন্ত সাপেক্ষে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. আহত ছাত্রদের চিকিৎসার সব দায়ভার নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিতে হবে। ৩. হকারদের হামলায় নিহত পথচারী নাহিদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৪. রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ৫. দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডিসি, এডিসি ও নিউমার্কেট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং পুলিশ প্রশাসনকে কলেজ প্রশাসনের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ৬. প্রতিটি মার্কেট ও দোকানে সিসিটিভি স্থাপন করতে হবে। ৭. প্রতিটি মার্কেটে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে। ৮. ফুটপাত দখলমুক্ত, অবৈধ কার পার্কিং উচ্ছেদ ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ৯. ক্রেতা হয়রানি, নারীদের যৌন হয়রানি বন্ধে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করে ক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ১০. চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটে ঢাকা কলেজের সম্পদ লিজ বাতিল করে ফিরিয়ে দিতে হবে।

এ দাবি অনতিবিলম্বে কার্যকর করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মোরসালিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক : ঢাকা কলেজ ও নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনজন। তাদের মধ্যে মোরসালিনের (২৬) অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি ছিলেন একজন দোকান কর্মচারী। তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায়। তিনি কামরাঙ্গীরচর পশ্চিম রসুলপুর এলাকায় থাকেন। তার ভাই নূর মোহাম্মদ জানান, নিউমার্কেট এলাকার নিউ সুপার মার্কেটের একটি দোকানে কাজ করত মোরসালিন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল বলেন, ‘আইসিইউতে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন আশা করি তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাদের চিকিৎসার কোনো ত্রুটি নেই।’