তহবিল থেকে অর্ধকোটি টাকা তছরুপ আ.লীগ নেতার

সাতক্ষীরার ভোমরা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (সিঅ্যান্ডএফ) আহ্বায়ক থাকাকালে জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক শেখ এজাজ আহমেদ স্বপন তহবিল থেকে অর্ধেকোটি টাকা তছরুপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে তিনি মাত্র চার মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি সাতক্ষীরা থেকে খুলনা পর্যন্ত যাতায়াত খরচ দেখিয়েছেন।

স্বপনের আহ্বায়ক কমিটির চার সদস্য গত ৫ এপ্রিল শ্রম অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ে তার বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপ ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে অনাস্থা প্রস্তাব দেন। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাকে অপসারণ করেন খুলনা শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং আশরাফুজ্জামান আশু, এএসএম মাকসুদ খান ও রামকৃষ্ণ চক্রবর্তীকে সদস্য করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে স্বপনের অভিযোগ, খুলনা বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক টাকা খেয়ে অবৈধভাবে কমিটিতে পরিবর্তন এনেছেন। তিনি রিট আবেদন করলে উচ্চ আদালত ও শ্রম আদালত নির্বাচন পরিচালনার যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন পরিচালক।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে সংগঠনটি গঠন করা হয়। শ্রম অধিদপ্তর থেকে শ্রমিক সংগঠন হিসেবেও তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। ফলে এ সংগঠনের যাবতীয় সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের দায়িত্ব শ্রম অধিদপ্তরের। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নির্বাচনের বিধান রয়েছে। কিন্তু শুরু থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কাগজে-কলমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখানো হলেও কমিটি হয়েছে সমঝোতার ভিত্তিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সর্বশেষ গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ সভায় সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে নওশাদ দিলওয়ার রাজুকে সভাপতি ও মোস্তাফিজুর রহমান নাছিমকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। এ কমিটিকে অবৈধ দাবি করে উচ্চ আদালতে রিট করেন শেখ এজাজ আহম্মেদ স্বপন। উচ্চ আদালত ওই কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার নির্দেশ দেয় শ্রম অধিদপ্তরকে।

শ্রম অধিদপ্তর উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত বছর ৩০ নভেম্বর স্বপনকে আহ্বায়ক এবং আশরাফুজ্জামান আশু, মিজানুর রহমান, এএসএম মাকসুদ খান ও রামকৃষ্ণ চক্রবর্তীকে সদস্য করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে। অবশ্য এ নির্বাচনের আগেই ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটার তালিকা নিয়ে সংগঠনের সদস্য এসএম মাকসুদ খান শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। ওই বছরের ২৩ মার্চ শ্রম আদালত অভিযোগের শুনানি শেষে স্বপনের আহ্বায়ক কমিটি বহাল রেখে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের নির্দেশ দেয়। গত ২৭ মার্চ শ্রম অধিদপ্তর স্বপনের আহ্বায়ক কমিটিকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু এরইমধ্যে গত ৫ এপ্রিল কমিটির চার সদস্য স্বপনের বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপ ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে অনাস্থা দিলে তাকে সরিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেয় শ্রম অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়।

এরপর ১০ এপ্রিল শ্রম অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে স্বপনকে অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়। নির্ধারিত দিনে স্বপন কার্যালয়ে হাজির হয়ে পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় পরিচালক তাকে মৌখিকভাবে অভিযোগের জবাব দিতে বললেও স্বপন আহ্বায়ক কমিটির চার সদস্যের অনাস্থা প্রস্তাবকে গঠনতান্ত্রিকভাবে অবৈধ দাবি করে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তে লিখিত আবেদন করেন। পরে শ্রম অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক দুপক্ষের অভিযোগ বিবেচনা করে স্বপনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাকে অপসারণ করেন।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে সংগঠনের তহবিলে মোট ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ৯২৫ টাকা আয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তহবিলে কোনো টাকা নেই। বিপুল পরিমাণ অর্থ কমিটির অন্য সদস্যদের না জানিয়ে ক্ষমতাবলে তুলে আহ্বায়ক স্বপন আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া দায়িত্বকালে মাত্র চার মাসে তিনি যাতায়াত খরচ দেখিয়েছেন ৯ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৭০০, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬৭০ ও ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৩০ টাকা দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাতায়াত খরচে যা দেখানো হয়েছে, তার বড় অংশ শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক কার্যালয়কে দিতে হয়েছে। আমার আহ্বায়ক থাকাকালে শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালককে বিভিন্ন সময় যাতায়াত খরচ, জাতীয় দিবস পালনসহ নানা কারণে ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে ঘুষ দিতে হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘অন্যদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা খেয়ে শ্রম পরিচালক আমাকে অপসারণ করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছেন বলে ভোমরা এলাকায় চাউর রয়েছে। অতীতেও তিনি কমিটির কাছ থেকে একইভাবে অর্থ নিয়েছেন।’

এ বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিদপ্তরের আদেশ স্বপনের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করছেন। এখানে ব্যক্তি আমার কিছু করার নেই। আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরাই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছেন। আমি দুইপক্ষের অভিযোগ শুনানি করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি।’

নতুন কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যারা দায়িত্বে থাকি, তাদের সাতক্ষীরা থেকে খুলনা শ্রম অধিদপ্তরে মাসে দু-একবার যেতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে কখনো পাঁচবার হয়। দিনে সর্বোচ্চ খরচ হয় ৫ হাজার টাকা। অথচ স্বপনের সময়ে চার মাসে ১০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, এটি অনেক বড় ঘাপলা। তিনি দায়িত্ব থাকাকালে মোট ৫২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা খরচ দেখিয়েছেন। এই টাকা তিনি কোনো সদস্যকে না জানিয়ে তহবিল থেকে ক্ষমতাবলে নিয়েছেন। আসলে তছরুপের জন্যই তিনি কাউকে জানাননি।’