পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে দুবার দায়িত্বরত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। তবে দুবারই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীরা ১৯৮৯ সালে বেনজির ভুট্টো এবং ২০০৬ সালে শওকত আজিজ দায়িত্বে থেকে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু জাতীয় পরিষদে বিরোধী জোটের আনা অনাস্থা ভোটে হেরে ৯ এপ্রিল ক্ষমতাচ্যুত হন ইমরান খান। এই অনাস্থা প্রস্তাবের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন তিনি। সরকার থেকে বিদায় নেওয়ার পর বিক্ষোভ প্রদর্শন ও একের পর এক সমাবেশ করছে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ বা ‘পিটিআই’। এখন দ্রুততম সময়ে নতুন নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার দলটি।
পাকিস্তানের রাজনীতি বিশ্লেষক আবদুল বাসিত মনে করেন, ইমরান খানের বিরোধীরা তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করলেও দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মি. খান তার কার্যক্রম নিয়ে কৃতিত্ব নিতেই পারেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও ইমরান খানের দল পিটিআই দরিদ্রদের মধ্যে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, এ রকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মতো একটি দেশে যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেনি, সেখানে সরকার উৎখাত হওয়ার পর বিরোধী দল কী-ইবা প্রতিশ্রুতি দিতে পারে? তড়িঘড়ি করে গঠন করা জোটের মাধ্যমে তৈরি সরকার কি পাকিস্তানের কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান দিতে পারবে? বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ মুহূর্তে এসব সমস্যার কোনো সমাধান নেই। তাই পাকিস্তান আগামী অন্তত এক থেকে দেড় বছরের জন্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে।
এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পাকিস্তানের নাগরিকরা। পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছুদিন ধরে রাস্তায় বিক্ষোভ হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী জোটের নেতা দুজনই ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৮ সালে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে পাকিস্তানকে মদিনা সনদের মূলনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করবেন তিনি।
লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আলি কাসমির মতে, ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খান ধর্মকে নতুন আঙ্গিকে এবং নতুন মোড়কে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উপস্থাপন করেন। ইমরান খানের এই পন্থার সমালোচনা করলেও বিরোধী দলের জোটগুলো বাধ্য হচ্ছে তাদের রাজনীতিতে মদিনা সনদের মূলনীতির উল্লেখ করতে। অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান দুজনেই তাদের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের কথা চিন্তা করেই ধর্মকে তারা ব্যবহার করছেন। কারণ এর আগের নির্বাচনে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-লাবাইক বিপুল ভোট পেয়েছিল। অধ্যাপক আলি কাসমি মন্তব্য করেন, ‘আমরা এমন একটা বাস্তবতার মধ্যে আছি যেখানে প্রতিযোগিতানির্ভর করবে ধর্মকে কারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পারবে, তার ওপর। পাকিস্তানের রাজনীতির ধরনই এ রকম, কারণ ধর্ম বাদে মানুষকে আমরা আর কিছু দিতে পারি না। পাকিস্তানে পিএমএল-এন, জেইউআই ও পিটিআই সব দলই ধর্মকে ব্যবহার করেছে।’
পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে ইমরান খানের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখনো ইমরান খানকে একটি বড় শক্তি বলেই মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম নির্মাতা লিয়াকত আলী খান এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীদের একজন। তিনি চার বছর ২ মাস ক্ষমতায় ছিলেন। রাওয়ালপিন্ডিতে মুসলিম লীগের এক জনসভায় ১৯৫১ সালে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ইমরান খানের আগ পর্যন্ত আরও ২১ জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছেন, তবে সুবিধা করতে পারেননি কেউই। লিয়াকত আলীর পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তিনিও ১৯৫৩ সালে গভর্নর জেনারেলের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের পর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে মাত্র দুই বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন মোহাম্মদ আলি বোগরা। অনাস্থা ভোটে তাকেও সরে যেতে হয়। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রেসিডেন্ট ও দলের নেতা ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে মতের অমিলে তাকেও মাত্র এক বছরের কাছাকাছি সময়ে পদ ছাড়তে হয়। টেকেননি কেউই; এরপর একে একে এসেছেন ইব্রাহিম ইসমেইল চুনদ্রিগার, ফিরোজ খান নুন, নুরুল আমিন। তাদের প্রধানমন্ত্রিত্বের বয়স যথাক্রমে ২ মাস, ১০ মাস ও ১৩ দিন। পরে জুলফিকার আলী ভুট্টোর অনুরোধে নুরুল আমিনকে প্রেসিডেন্ট, জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় তাকে ১৩ দিনেই ক্ষমতা ছাড়তে হয়। পাকিস্তানের ক্ষমতার পালাবদলে এরপর আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। তবে ১৯৭৭ সালেই তাকে লাহোর হাইকোর্টের দেওয়া রায় অনুযায়ী জেলে ভরা হয়। এবং ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া-উল-হকের ক্ষমতায় থাকাকালে হত্যার অভিযোগে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
এ ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে যখন দেশ গঠনে একটি সুস্থ সাবলীল সরকার ব্যবস্থা একান্ত দরকার ছিল, তখন পাকিস্তান তা পায়নি। পাকিস্তানের অধিকাংশ প্রধানমন্ত্রীই পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দুর্নীতি অথবা সামরিক প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে বিতণ্ডার কারণে। পাকিস্তান তাদের প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পায় ১৯৮৮ সালে। তিনি বেনজির ভুট্টো। তবে দুর্নীতির দায়ে তাকেও পদ ছাড়তে বাধ্য করেন প্রেসিডেন্ট গুলাম ইশক খান। এরপর আসেন নওয়াজ শরিফ। তিনিও তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রেসিডেন্ট গোলাম ইসহাক খানসহ পদত্যাগ করেন।
ক্ষমতার দোলাচলে এরপরে যারা এসেছেন তাদের গতিবিধি ক্রিকেটে দুর্বল দলের ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার মতোই। দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা কখনো পিছু ছাড়েনি দেশটির। ১৯৯৩ মঈনউদ্দিন কুরেশি সাংবিধানিক কারণে বিদায় নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বেনজির ভুট্টোর কাছে। বেনজির এবার তার পূর্বেকার চেয়ে কিছু সময় বেশি ক্ষমতায় থাকলেও আবারও প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমাদ লেহগারির আনা দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্টদের তালিকায় পারভেজ মোশাররফ আসার পর ভোটের মাধ্যমে আবারও নির্বাচিত হন নওয়াজ শরিফ। ১৯৯৯ সালে এক ক্যুর মুখে তিনিও ক্ষমতা ছাড়ার পর ইউসুফ রাজা গিলানি আসা পর্যন্ত আরও তিনজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন আর গিয়েছেন। ইউসুফ রাজা গিলানি এসে ৪ বছর ক্ষমতায় থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে তিনি অযোগ্য ঘোষিত হয়ে ক্ষমতা ছাড়েন। তারপরে রাজা পারভেজ আশরাফ এসে মাত্র এক বছরের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দুর্নীতির অভিযোগে। পানামা পেপারসে নাম আসার পর নওয়াজ শরিফ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেও ১০ বছরের জন্য জেলে যান তিনি।
অনেকে বলেন ইমরানের দল পিটিআইয়ের আত্মকেন্দ্রিক ন্যায়পরায়ণতা তাদের এমন অবস্থার জন্য দায়ী। জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটানোর বদলে দলটি বিষাক্ততা ছড়িয়েছে এবং ঔদ্ধত্য আচরণ দেখিয়েছে বারবার। ঔদ্ধত্য ও অভিমানের যুগলবন্দিতে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। সময় ও পরিস্থিতিই বলে দেবে কোনোদিকে যাবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
লেখক : গবেষক ও কলামনিস্ট
raihan567@yahoo.com