অর্থনীতির সাধারণ সূত্র হলো চাহিদা আর জোগানের ভারসাম্য থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু আমাদের দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্ভবত এমনই মুক্ত যে, কেবল চাহিদা আর জোগানই নয় এক অদৃশ্য হাত রয়েছেযা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। খুচরা ব্যবসায়ী আর দোকানি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই অদৃশ্য হাতকে সিন্ডিকেট হিসেবে চেনে। চাল, ডাল, চিনি কিংবা ভোজ্য তেল সব নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণেরই নানা সিন্ডিকেট আছে। রোজার মাসে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে প্রতিবারই অনেক কথা হলেও দাম নিয়ন্ত্রণে সফলতা কমই দেখা যায়। এখন যেমন ঈদের আগে আগে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা দেখা যাচ্ছে বাজারে। খেয়াল করা দরকার, দেশে ভোজ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে সরকার দুই দফায় ৩০ শতাংশ ভ্যাট মওকুফ করেছে। কিন্তু তবুও গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের বাজার চড়া। বুকিংয়ে প্রতিদিনই অল্প অল্প করে দাম বাড়ছে। এ কারণে দেশের বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে পাম তেলের দাম মণপ্রতি বেড়েছে ৭৫০ টাকা এবং সয়াবিনের দাম মণপ্রতি বেড়েছে ৬৫০ টাকা। খুচরায় দাম না বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কমেছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, নতুন করে আবারও দাম বাড়াতে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তরে শুক্রবার ‘ভোজ্য তেলের বাজার ফের অস্থির করার পাঁয়তারা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভোজ্য তেলের দামে অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত দুই সপ্তাহ আগে মণপ্রতি পাম তেল বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৫০ টাকায়। বর্তমানে ৭৫০ টাকা বেড়ে পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৮৫০ টাকায় এবং একই সময়ে মণপ্রতি সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ টাকায়, বর্তমানে মণপ্রতি ৬৫০ টাকা বেড়ে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৫০ টাকায়। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভোজ্য তেলের বাজার আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেই প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দামের তুলনায় আমাদের দেশের বাজারের দাম এখনো কম আছে। জেনেছি আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হওয়ায় বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। তাই বাজারে সরবরাহ সংকট হচ্ছে বলে আমার ধারণা। একই কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ীর বক্তব্যেও। দেশ রূপান্তরকে ওই ব্যবসায়ী বলেন, সরকারের চাপে কোম্পানিগুলো এখন নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করছে। কিন্তু ঈদের পর দাম বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া চলছে। তাই ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এ জন্য বাজারে নতুন করে ভোজ্য তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।
ভোজ্য তেল আমদানির আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর। দেখা যাচ্ছে এক সপ্তাহ আগে প্রতিকেজি খোলা সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা করে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিতে ২৫ টাকা করে দাম বেড়েছে। আর বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৮ টাকা লিটার মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। সরেজমিনে হিলি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের সব দোকানেই তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে, তারপরও তেলের দাম বাড়তির দিকে। এদিকে তেলের বাড়তি মূল্য নেওয়া হলেও কোনো রসিদ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের। অন্যদিকে, সাধারণ ক্রেতারাও ইতিমধ্যেই ভোজ্য তেলের এই কৃত্রিম সংকটে ভুক্তভোগী হচ্ছেন। রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ৫ লিটারের তেলের বোতল উধাও। বেশিরভাগ দোকানে এক লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে। আবার অনেক দোকানে তেল বিক্রি করা হচ্ছে না।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন কারোরই যেন কিচ্ছু করার নেই এমন সব সিন্ডিকেটের বাজার কারসাজি বন্ধ করতে! অথচ কোন প্রক্রিয়ায় আমদানিকারক-মজুতদার-পাইকারি বিক্রেতারা ভোজ্য তেল কিংবা এ ধরনের নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করেন আর পণ্যমূল্যে অস্থিরতা তৈরি করেন সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা এসব সরকারি দপ্তরের কারোরই অজানা থাকার কথা না। এখন ঈদের আগে ভোজ্য তেলের বাজারে দাম বাড়ানোর এই পাঁয়তারা বন্ধ করতে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।