বিএনপিতে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নেতাদের দলে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও এখনো তারা যথাযথ মর্যাদা পাননি। তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য খেতাব পেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও দলের নেতৃত্ব পর্যায়ে স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না তাদের। দলের কর্মসূচিতেও তাদের ডাকা হয় না। এমন বেশ কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে তাদের আক্ষেপের কথা বলেছেন।
তারা বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনে তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে দীর্ঘদিন দলের বাইরে ছিলেন। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাদের দলে ফিরিয়ে নেন। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করে। কিন্তু যোগ্যতা অনুযায়ী দলে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পদায়ন করা হয়নি এখনো।
একই সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সামনের দিনগুলোতে যে আন্দোলন সংগ্রাম হবে তার আগে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তাদের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম সফল করার সুযোগ দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে দলবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় তারা বিএনপির রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। চেয়ারপারসন তাদের দলে ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এরপর তো বিএনপি কাউন্সিল করতে পারেনি। কাউন্সিল করলে নিশ্চয়ই দলে তাদের পদায়ন হবে। এজন্য তাদের ধৈর্য ধরতে হবে।’
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের (ওয়ান ইলেভেন) পর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা দল সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন। অভিযোগ ওঠে, ওই নেতারা খালেদা জিয়াকে বিএনপি থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই বছরের জুন মাসে তৎকালীন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে দলের যেসব নেতা সক্রিয় ছিলেন তারা তখন পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন ও দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।
তখন মান্নান ভূঁইয়া বলেছিলেন, তাদের সঙ্গে দলের ১১৬ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। তারা তৎকালীন একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ফ্যাক্স করে বিএনপির রাজনীতি না করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এছাড়া যারা কারাগারে গিয়েছিলেন তাদের কেউ কেউ ওই গোয়েন্দা সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।
তখন ‘সংস্কারপন্থি’ অংশের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। মহাসচিব হয়েছিলেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সাইফুর রহমান ও মান্নান ভূঁইয়া মারা গেছেন। হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ওয়ান ইলেভেনের পরেই নিজের ভুল স্বীকার করে বিএনপিতে যোগদান করেন।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২৬ অক্টোবর সংস্কারপন্থি ১১ নেতাকে বিএনপিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাবেক মন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্য ছিলেন। সে সময় দলে ফেরা নেতারা হলেন সাবেক মন্ত্রী আলমগীর কবির, সাবেক হুইপ আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমান, আবু হেনা, গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, নজির হোসেন, ডা. জিয়াউল হক, আতাউর রহমান আঙ্গুর, ইলেন ভুট্টো, শফিকুল ইসলাম তালুকদার, শহিদুল আলম তালুকদার ও জহির উদ্দিন স্বপন।
তাদের মধ্যে জহির উদ্দিন স্বপন বর্তমানে ভালো আছেন। বিএনপির মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে আছেন। জিএম সিরাজ বর্তমানে সংসদ সদস্য।
‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের সবাই দলে ফিরেছেন কি না জানতে চাইলে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কারপন্থিদের মোটামুটি সবাই দলে ফিরেছেন।’ তিনি আপেক্ষ করে বলেন, ‘বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করে কিন্তু তার মতো একজন খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযোগ্য সম্মান দিচ্ছে না বিএনপি।’
হাফিজ উদ্দিন দুঃখ করে বলেন, ‘গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচিতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বর্তমানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কজন নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চিনতেন? আমি তার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানি ও বলতে পারি। অথচ আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি।’
সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করে। কিন্তু খেতাবধারী কজন নেতাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করেছেন। আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন কমান্ডার ছিলাম। আমাদের মতো নেতাদের মূল্যায়ন করলে এবং খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হলে স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব বাড়ত, ভাইব্রেন্ট (প্রাণবন্ত) হতো। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপির দাবি মজবুত হতো।’
মফিকুল হাসান তৃপ্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি সংগ্রামের রাজনীতি। সংগ্রাম করে রাজনীতিতে এখনো টিকে আছি। দীর্ঘদিন পর দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমানকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক করার পর মহানগরের রাজনীতি জেগে উঠেছে। আমাদের মূল্যায়ন করলেও দল এভাবে জেগে উঠবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে জানান, দল তাদের ফিরিয়ে নিলেও যথাযোগ্য মর্যাদা দিচ্ছে না। ‘চাকর-বাকরের’ মতো ব্যবহার করে। এভাবে মর্যাদা নিয়ে রাজনীতি করা যায় না। নিজে থেকে এখন কোনো কর্মসূচিতে যান না। দলও ডাকে না। তাই নীরবে নিবৃত্তে সময় কাটাচ্ছেন।
ওয়ান ইলেভেনের পর ২০০৭ সালে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের পর মান্নান ভূঁইয়াকে বাদ দিয়ে মহাসচিব করা হয় দেলোয়ার হোসেনকে। তখন বহিষ্কৃত নেতাদের বাদ দিয়ে অন্যদের দল পরিচালনার জন্য দেলোয়ার হোসেনকে নির্দেশ দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কিন্তু দলের মহাসচিব তখন সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত সবাইকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন।
এ বিষয়টি উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের ওই ভাইস চেয়ারম্যান আপেক্ষ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার ফল ওয়ান ইলেভেনের সরকারের আমলে বিএনপি যেমন পেয়েছে তেমনি এখনো পাচ্ছে। যারা সংস্কারপন্থি হয়েছিলেন তাদের অনেকেই যোগ্য ছিলেন। যোগ্যদের বাদ রেখে আন্দোলন সংগ্রাম কীভাবে সফল হবে।