জমে উঠছে ‘গরিবের মার্কেট’ ফুটপাত

রাজধানীতে জমে উঠছে ‘গরিবের মার্কেট’ খ্যাত ফুটপাতের বেচাকেনা। ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ফুটপাতের দোকানগুলোতে স্বল্প আয়ের ক্রেতা সমাগম বাড়ছে। ক্রেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য মোকাবিলা করে জীবনযাপন করে সবখানে ঈদের কেনাকাটা করা কঠিন। ফলে ফুটপাতেই ভরসা। বিক্রেতারা বলছেন, সব জিনিসের দাম বেড়েছে। ফুটপাতে বিক্রি পোশাকের দামে পরিবর্তন এসেছে। একটি পোশাকে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা এখনো পাচ্ছেন না তারা। তবে দু-একদিনের মধ্যে ক্রেতা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন দোকানিরা।  

গতকাল রবিবার রাজধানীর পুরানা পল্টন, জিরো পয়েন্ট, বায়তুল মোকাররমসহ গুলিস্তানের বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের দোকানি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। ঢাকার অন্যতম এ ব্যস্ততম এ এলাকার ফুটপাতে সারা বছর পোশাক, জুতা থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের নিত্যব্যবহার্য পণ্য পাওয়া যায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে। ঈদের সময় এখানে ক্রেতা সমাগম সংগত কারণেই বেশি হয়। এসময় সকাল থেকে মধ্যরাত অবদি জমজমাট থাকে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের হাঁকডাকে।

গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট মোড়ে বামপাশে শিশুদের পোশাকের পসরা নিয়ে বসেছেন ইমরান (২২)। আলাপকালে বলেন, দুই বছরে করোনার কারণে ব্যবসা একেবারেই খারাপ গেছে। এখন এই ঈদে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে, ক্রেতা বাড়লেও এখনো তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জমে ওঠেনি বলে মনে করেন তিনি। ইমরান বলেন, ‘চানরাইত পর্যন্ত দেহন লাগব। এই দিক দিয়া সদরঘাট হইয়া মানুষ ঢাকা ছাড়ব আর কিনতে আসব। হেই আশায় আছি। বেচা বিক্রি শেষ কইরা আমরাও বাড়িত যামু।’ একই দোকানে শিশুদের পোশাক কিনতে এসেছিলেন আব্দুর রহিম। আলাপকালে বলেন, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে কলার ব্যবসা করেন তিনি। দুই ছেলে-মেয়ের জন্য জামা ও প্যান্ট কিনতে এসেছেন। কিন্তু দাম অন্যবারের চেয়ে একটু বেশি মনে হচ্ছে তার কাছে। তিনি বলেন, ‘আমার মতো গরিবেরা তো বড় মার্কেটে যাইতে পারি না। এইহানেই ভরসা। ঢাকায় আইছিলাম ব্যবসার কাজে। লগে পোলাপানের জামা জুতা কিইন্না বাড়িত যাব।’ 

গুলিস্তানের বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন নূর  মোহাম্মদ (৬০)। তার দাবি ৪০ বছর ধরে এই এলাকায় বিচরণ তার। জিরো পয়েন্ট এলাকায় ছোট মেয়েদের পোশাক বিক্রি করছেন তিনি। বলেন, ‘গুলিস্তান এহনো জমে নাই। মানুষ আসতাছে। দামও কইতাছে। দোকান বেশি। দেইখ্যা শুইন্যা কিনার সুযোগ বেশি। আমরাও ২০/৫০ ট্যাহা লাভ পাইলে বেইচ্যা দেই।’  তিনি বলেন, সব জিনিসের দাম বেড়েছে। ফুটপাতে বিক্রি হওয়া পোশাকের দামেও পরিবর্তন এসেছে। একেকটি পোশাকে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান তিনি। 

ঈদে পাঞ্জাবির চাহিদা থাকে তুঙ্গে। গুলিস্তানের বিভিন্ন ফুটপাতের পাঞ্জাবির দোকানগুলোতে এখনো প্রত্যাশিত ভিড় লক্ষ করা যায়নি। ফুটপাতের চারজন পাঞ্জাবি বিক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাত্র ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০ টাকা দিয়ে পাঞ্জাবি কিনতে পারা যায় এখান থেকে। যে কারণে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এসব পাঞ্জাবির আলাদ কদর রয়েছে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকার পাঞ্জাবি বিক্রেতা হায়দার আলী বলেন, পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে এখন মার্কেট। তাই ক্রেতাদের সঙ্গে অনেক দরাদরি করে বিক্রি করতে হয়। আবার পাশাপাশি আরও দোকান রয়েছে। চাইলেই আর আগের মতো লাভ থাকে না। 

গুলিস্তানের ফুটপাতে ছেলের জন্য পোশাক কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকুরে নাটোর সদরের ইমরান হোসেন (৩০)। আলাপকালে বলেন, ‘ঈদে সবসময়ই চেষ্টা থাকে পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু কেনাকাটা করার। নিত্যপণ্যের যে দাম তাতে এখন আর আগের মতো কিছু কিনতে গেলে হিসাব করতে হয়। আর্থিকভাবে সময়টা একটু খারাপ যাচ্ছে। কেনাকাটাতেও কিছুটা কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সুলভমূল্যে সীমিত বাজেটে ফুটপাতেও ভালো জিনিস পাওয়া যায়। তাই এখানে আসা।’

গুলিস্তানের হকার্স মার্কেটের সামনের ফুটপাতে ছোটদের জিন্স প্যান্ট বিক্রি করেন নাসির মিয়া। তিনি বলেন, ‘ঈদে ছোট শিশুদের পোশাকের চাহিদা থাকে। কিন্তু এবার দোকানে অনেক পোশাক তুলেছি। কিন্তু এখনো বেচাবিক্রি জমেনি। দুএকদিনের মধ্যে ব্যবসা জমে উঠবে বলে আশা নাসিরের।’ একই ফুটপাতে শিশুদের পোশাক বিক্রেতা সুমন বলেন, ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০ টাকা দিয়ে শিশুদের ভালো পোশাক পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকেই দরাদরি করে কম দামে কিনতে চান। একই জিনিস বড় মার্কেটে গেলে দাম বেশি পড়বে। এ বিষয়টি শতেকবার বোঝাতে হয়। বায়তুল মোকাররম এলাকার দক্ষিণ গেটের পাশে পাঞ্জাবি বিক্রেতা রানা বলেন, পাঞ্জাবির ক্রেতারা আসতে শুরু করেছেন। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ভালো বিক্রির আশা করছেন তিনি।