সেমিনারে পিটার হাস

নির্বাচনে কোনো পক্ষ নেবে না যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে, কারা দেশকে নেতৃত্ব দেবে। এ সময় র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে পিটার হাস বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।

গতকাল রবিবার ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক : সহযোগিতা বৃদ্ধি ও অংশীদারত্বের দিকে অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পিটার হাস। এ সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্ত্যবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ অন্যদের আমরা স্বাগত জানাই। নির্বাচনে যেকোনো দেশ চাইলেই তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে পিটার হাস আরও বলেন, ‘নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ থাকা উচিত। সাংবাদিকরাও যাতে তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরিবেশ পায় সেটিও নিশ্চিত হওয়া উচিত।’

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমারিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়ে পিটার হাস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘জিসোমিয়া’ ও ‘আকসা’ চুক্তি হলো উভয় দেশের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া। বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের চুক্তি রয়েছে।  তবে এই চুক্তি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। আমরা এই চুক্তির গ্রাউন্ড তৈরি করছি।’

আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সরকার এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতা ও অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অগ্রগতিতে এবং উভয় দেশের প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নে তার প্রয়াস চালিয়ে যাবে।’

সেমিনারে জিএসপি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য তাদের জিএসপি সুবিধা বহাল রাখুক। এজন্য আমাদের করণীয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরামর্শ দিতে পারে। যদিও আমরা এরই মধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট সুবিধা নিশ্চিত করেছি।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে যুক্তরাষ্ট্র গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়ায় দেশটিকে ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ড. মোমেন আশা প্রকাশ করেন যে, এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সব দেশের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করে যাবে।

সেমিনারে র‌্যাবের কার্যক্রম সম্পর্কে তুলে ধরেন র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে তাদের সহযোগিতা দিয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলা ও শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বেশ কিছু সামরিক মহড়া দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে,  এর মধ্যে সমুদ্রসীমা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সবসময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে আরও কিছু যোগ করতে চেয়েছে। তারপরও দুই দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, সন্ত্রাস দমন থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলেন, ‘বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বের মধ্যে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন কারণ আমরা কী করছি, কোথায় অবস্থান করছি, এজন্যই।  অর্থনৈতিকভাবে দুই দেশেরই সম্পর্ক ভালো হচ্ছে। কিন্তু দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে।’

বিআইআইএসএসের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, দূতাবাসের প্রতিনিধি, সাবেক কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, একাডেমিয়া, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও তাদের মতামত তুলে ধরেন।