পরোক্ষ ধূমপানে বছরে ২৫ হাজার মৃত্যু

পরোক্ষ ধূমপানজনিত কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬১ হাজার শিশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৪২ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে এর প্রভাব স্পষ্ট। একই কারণে বছরে মারা যাচ্ছে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকোর সর্বশেষ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গণপরিবহনে, ৪৯ দমমিক ৭ শতাংশ রেস্তোরাঁয় এবং ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ চা-কফির স্টলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। প্রায় ৩৯ শতাংশ বা ৪ কোটি ৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) ৫৯ শতাংশ পাবলিক প্লেসে এবং ৩১ দশমিক ১ শতাংশ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবহুল স্থানে ধূমপানের ফলে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে তৈরি হচ্ছে নারী ও শিশুদের। অধূমপায়ীদের রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ‘ধূমপানে নির্ধারিত স্থান’ বা ‘ডেজিগনেটেড স্মোকিং জোন’ বিলুপ্তির পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পাবলিক প্লেস ও পরিবহন শতভাগ ধূমপানমুক্ত করার সুযোগ নেই। ফলে পরোক্ষ ধূূমপানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্ত করতে হবে। দেয়ালঘেরা নয় এমন রেস্তোরাঁ, হোটেল, পাবলিক প্লেস, একাধিক কামরাবিশিষ্ট পরিবহন ও সব অযান্ত্রিক গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরোক্ষ ধূমপানের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। তামাকের ধোঁয়ায় সাত হাজার রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টিতে ক্যানসারের উপাদান বিদ্যমান। এতে ফুসফুস ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগের মতো বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবে বিশ্বে বছরে প্রায় ১২ লাখ মানুষ অকালে মারা যায়। বাংলাদেশে এ সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। অধূমপায়ী যারা বাড়িতে কিংবা কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি ২৫-৩০, স্ট্রোকের ঝুঁকি ২০-৩০ ও ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি ২০-৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। জন্মের পর যেসব শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, তাদের মধ্যে সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোমের (এসআইডিএস) ঝুঁকি বেশি থাকে। পরোক্ষ ধূমপানের শিকার শিশুদের ঘনঘন কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ যেমন ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া বা হাঁপানি হয়ে থাকে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বয়স্কদের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান নারী ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। যেসব শিশু জন্মের পর পরোক্ষ ধূমপানের শিকার, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ তাদের মৃত্যু হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত স্থানের চেয়ে বন্ধ ঘরে ধূমপান পরোক্ষভাবে বেশি ক্ষতিকর। আমরা চাই, “ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান” বন্ধ হোক।’

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০০৫ অনুযায়ী, চতুর্দিকে দেয়াল দিয়ে আবদ্ধ রেস্টুরেন্টসহ অধিকাংশ আচ্ছাদিত পাবলিক প্লেস ও কর্মক্ষেত্রে ধূমপান নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ পাবলিক প্লেস ও একাধিক কামরাবিশিষ্ট পাবলিক পরিবহনে (ট্রেন, স্টিমার ইত্যাদি) ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ রাখা আছে। এতে অধূমপায়ীদের পাশাপাশি এসব স্থানে সেবা দিতে গিয়ে কর্মীরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। বিদ্যমান আইন পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীকে সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) ধারা ৮ ও এ সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এফসিটিসির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সদস্য সচিব হোসনে আলী খোন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করার পর ২০১৩ সালে এটি সংশোধন করা হয়। আইনটি আরও শক্তিশালী করতে তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন সুপারিশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।’