ঈদে সরব পর্যটনকেন্দ্র

করোনা নিয়ন্ত্রণে নানা বিধিনিষেধের কারণে দুই বছর পর ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে দেশবাসী। স্বভাবতই এবার ঈদ ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাসও বেশি। বিশেষ করে নগরবাসীদের একাংশ যেমন গ্রামের বাড়িতে যাবে তেমনি আরেকটি অংশ যাবে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ঘুরতে। দুই বছরের বেশি সময় বিরতির পর বিপুলসংখ্যক পর্যটক বরণ করতে ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। গত দুই বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার ঈদে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নও দেখছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। ভ্রমণপিপাসুদের অনেকেই ইতিমধ্যে ওইসব এলাকার হোটেল-মোটেলে আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় প্রশাসনও পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়ে রেখেছে।

দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত

আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতে কক্সবাজারে লাখো পর্যটক ভ্রমণের আশা করছেন খাতটির ব্যবসায়ীরা। ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে ৬০ শতাংশ কক্ষের আগাম বুকিং হয়ে গেছে। তাদের আশা ঈদে পরের দুই-তিন দিন কোনো হোটেলই জায়গা খালি থাকবে না। তাই পর্যটকদের বরণ করতে নগরীর পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউজ সব ধরনের প্রস্তুতি সেরে রেখেছে।

হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্টের ম্যানেজার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পবিত্র রমজানের এক মাস কক্সবাজার ভ্রমণ করতে পারেননি পর্যটকরা। এখন ঈদের পরে রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক আসবেন। এজন্য আমাদের হোটেলে বেশিরভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে।’

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, ‘এখন গরমের সময়। এছাড়াও পর্যটনের শেষ মৌসুম। এরপরও ঈদের পরের দুই সপ্তাহ লাখো পর্যটক সমাগম হবে বলে আশা করছি।’

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার জিল্লুর রহমান বলেন, ‘রমজানে পর্যটকের উপস্থিতি কম হলেও ঈদের ছুটিতে সমাগম ঘটবে। তাই পর্যটকের সেবা নিশ্চিত করতে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছে প্রশাসন। পর্যটকের কাছ থেকে হোটেল-মোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রাঙ্গামাটিতেও হোটেল-মোটেলের ৭০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। বিশেষ করে সাজেক ভ্যালির সৌন্দর্য অবলোকন করতে ইতিমধ্যে বেশিরভাগ হোটেল বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের বরণের প্রস্তুতিও সেরেছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট বোট ও রেস্টুরেন্টগুলোর রঙিন করে তোলা হয়েছে।

রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কাপ্তাই হ্রদে নৌবিহার। কেউবা দূরের শুভলংয়ের জলপ্রপাতে স্বস্তি খোঁজেন, কেউবা হ্রদের নীল জলে ডুব দিয়ে বা হ্রদের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর পাহাড়ের সৌন্দর্যে খোঁজেন তৃপ্তি। আর এ কাজে নিয়োজিত জেলার প্রায় ৫০০ ইঞ্জিনচালিত বোট। সবচেয়ে বেশি বোট মেলে বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুর পাড়ের ঘাটেই। এ ঘাটের ব্যবস্থাপক রমজান আলী জানান, এর মধ্যেই বেশিরভাগ বোটই নিজেদের প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সেরে নিয়েছে। কেউ রঙ করেছে, কেউ সিট বা সিটের গদি বদলেছে। অনেকেই লাইফ জ্যাকেট কিনেছে নতুন করে কিংবা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে নিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রস্তুতি আছেই কমবেশি সবার।

রাঙ্গামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়–য়া বলেন, ‘আমাদের মোটেল-কটেজে ৮৮টি রুম আছে। এর মধ্যে ৭০ ভাগেরও বেশি বুকিং হয়ে গেছে। আশা করছি বাকিগুলোও এ সপ্তাহের মধ্যে বুকিং হয়ে যাবে। বছরের এই সময়টার জন্য আমরা এমনিতেই প্রস্তুত থাকি। এ বছরও ব্যতিক্রম হবে না।’

রাঙ্গামাটি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দিন সেলিম বলেন, ‘করোনাকালের কঠিন সময়ে হোটেলগুলো দুঃসহ সময় পার করেছে, অনেকেই হোটেল বন্ধও রেখেছে। আশা করছি এ মৌসুমে সবাই ঘুরে দাঁড়াবে। সবাই সেই প্রস্তুতিই নিয়ে রাখছে।’

এদিকে পর্যটক ভ্রমণ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে প্রশাসন খুবই কঠোর রয়েছে। কোনোভাবে যাতে পর্যটকরা হয়রানির শিকার না হন সে বিষয়ে নজর রেখেছে পুলিশ প্রশাসন।

রাঙ্গামাটি ট্যুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ঈদে রাঙ্গামাটিতে প্রচুর পর্যটক আসবেন, এমনটাই ধারণা করছি আমরা। পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

বান্দরবান শহরের হোটেল-মোটেলগুলোতেও প্রায় অধিকাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়ে গেছে। হোটেল হিলটনের ব্যবস্থাপক এসএম আক্কাস উদ্দীন জানিয়েছেন, পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো রমজান মাস জুড়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন। হোটেলের রুমগুলো ভালোভাবে সাজানো হয়েছে। ঈদের পরের দিন থেকে পর্যটকের চাপ রয়েছে। ৫-৬ তারিখ হোটেলের ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়ে গেছে।

পর্যটনকেন্দ্র নীলাচলের পথে ফানুস রিসোর্টের ব্যবস্থাপক বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য আমাদের রিসোর্ট পুরোটাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখেছি। এর মধ্যে অনেকে কক্ষের জন্য আগাম বুকিং দিয়েছেন। মনে হচ্ছে ছুটিতে এবার প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটবে।’

এদিকে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে ভাড়া গাড়ির ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটররাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফোরহুইলার গাড়ির মালিক ও চালকরা জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলার তিন শতাধিক পর্যটক গাইড, দুই শতাধিক চাঁদের গাড়ির (ফোরহুইল গাড়ি) চালক অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

পর্যটন হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ঈদে লম্বা ছুটি থাকার কারণে এখানে প্রচুর পর্যটক আসবেন। এখানে ৭০টি হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট আছে। এর ৫০ শতাংশের বেশি বুকিং হয়ে গেছে।

বান্দরবানের ট্যুরিস্ট পুলিশ পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, এখানে অনেক পর্যটকের সমাগম হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটা পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পর্যটকদের বরণ করতে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে সাগরকন্যাখ্যাত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পর্যটননগরী কুয়াকাটা। ঈদের দিন থেকে প্রায় লক্ষাধিক পর্যটকের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠবে সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা। এমন প্রত্যাশাকে সামনে রেখে আলোকসজ্জাসহ রঙের আস্তরণ আর নতুন কারুকার্যে সজ্জিত হয়েছে অধিকাংশ হোটেল-মোটেল-কটেজ ও বাজার। সৈকতে বসেছে খাবারসহ নানা পণ্যের ভ্রাম্যমাণ দোকান।

এদিকে কুয়াকাটার ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের লেম্বুর বন, গঙ্গামতির চর, চরবিজয়, বাউলি বন, টেংরাগিরি, ফাতরার বন, তিন নদীর মোহনা, শ্রীমঙ্গল ও সীমা বৌদ্ধ মন্দির, রাখাইন মার্কেট, শুঁটকি পল্লী, শুঁটকি মার্কেট, মৎস্য বন্দর, ঝাউবাগান, ইকোপার্কসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান নিরাপদ ভ্রমণে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোন।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল মোতালেব শরীফ বলেন, ‘এরই মধ্যে ৯০ শতাংশ হোটেল-মোটেল-কটেজের কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। আগত যেসব পর্যটক কক্ষ পাবেন না, তাদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল খালেক বলেন, ‘পর্যটকদের নির্বিঘেœ চলাচলের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটক বরণে প্রস্তুত চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজার জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোও। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় চেনারূপে ফিরবে জেলার ট্যুরিস্ট স্পটগুলো; এমনটাই প্রত্যাশা পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। ঈদের দিন ও এর পরের কয়েক দিন প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে এ জেলায়। পর্যটকদের সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রস্তুতি নিয়েছেন।

কমলগঞ্জের সারি সারি চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, শ্রীমঙ্গলের বদ্ধভূমি একাত্তর, চা গবেষণা কেন্দ্র, বাইক্কা বিল ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন পর্যটকরা।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক এস কে দাশ সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রায় শতাধিক কটেজ-রিসোর্ট আছে। বেশিরভাগই বুকিং হয়ে গেছে ঈদের ছুটিতে। করোনায় আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে ধীরে ধীরে তা কমে আসবে বলে মনে করছি।’

লাউয়াছড়া ইকো ট্যুরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সহসাধারণ সম্পাদক মো. আহাদ মিয়া বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে লাউয়াছড়াসহ সব পর্যটনকেন্দ্রে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে। এর জন্য ২৫ জন গাইড প্রস্তুত রয়েছেন। অনেক পর্যটক ইতিমধ্যে যোগাযোগও করেছেন।’

ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের জনবল নিয়ে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত। ঈদুল ফিতরে বাড়তি নিরাপত্তার কথা চিন্তায় রেখে টহল পুলিশ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ টিম গঠন করেছি। প্রতিটি টিম পর্যটন এলাকায় টহলরত থাকবে।’