দোকানে তামাক পণ্যের প্রদর্শনী বাড়ছে ধূমপায়ী শিশু-কিশোর

দেশের সব ধরনের গণমাধ্যম, প্রকাশিত কোনো বই বা ছাপা কাগজে কিংবা বিলবোর্ড বা সাইনবোর্ডে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। তবে তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে তাদের পণ্যের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে ছোট ছোট স্টিকারের পাশাপাশি সিগারেট প্যাকেট প্রদর্শনী একপ্রকার বাধ্যতামূলকই করেছেন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা। শিশুদের নানা মুখরোচক খাবারের পাশেও সাজিয়ে রাখা হচ্ছে সিগারেটের প্যাকেট, যা দেখে আকৃষ্ট হচ্ছে কৌতূহলী শিশু-কিশোররা। বয়স্কদের তুলনায় তারা কিনছেও বেশি। 

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বিভিন্ন দোকানি ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা এমন তথ্যই জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আবুল কালাম ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট বিক্রি করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাহবাগ মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বেগম রোকেয়া হলের আশপাশে ফুটপাত ও ভ্রাম্যমাণ মিলিয়ে সিগারেটের দোকান আছে ৬০-৭০টি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ মিনার, পলাশীর মোড়, নীলক্ষেত মোড় মিলিয়ে এই সংখ্যা ১৮০-২০০। এর মধ্যে যারা বসে সিগারেট বিক্রি করে তাদেরকে কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের গিফট দেয়। সেলফ সাজিয়ে দেয়। এসব দোকান থেকেই কিশোর-তরুণরা বেশি কিনছে সিগারেট।

ওই এলাকার আরেক সিগারেট বিক্রেতা আলম শেখ জানান, কোনো কোনো দিন ডাল গলায় ঝুলিয়ে বিক্রি করি। আবার কোনো দিন একটা নিদিষ্ট জায়গায় বসে বিক্রি করি। আমার সব ক্রেতা তরুণ-যুবক। প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি হয়।

একটি সমীক্ষায় রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশপাশে প্রায় ৭৫ শতাংশ খুচরা বিক্রেতাকে কোনো না কোনো উপায়ে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন এবং ৩০ শতাংশ খুচরা বিক্রেতাকে শিশুদের চোখ বরাবর স্থানে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। এসব প্রদর্শনের জন্য তামাক কোম্পানিগুলো প্রণোদনাও দিয়ে থাকে।

গ্লোব্যাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকোর সবশেষ সার্ভের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৯ শতাংশই তরুণ। প্রাপ্তবয়স্কদের (১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব) মধ্যে তামাক ব্যবহার করে ৩৫ দশকিম ৩ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ পুরুষ ও ২৫ দশমিক ২ শতাংশ নারী। আর অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) মধ্যে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করে। এদের মধ্যে ছেলে ৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং মেয়ে ২ শতাংশ। টোব্যাকো অ্যাটলাসের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি।

তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের (এফসিটিসি) গাইডলাইন অনুযায়ী বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা এবং পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার করেছেন তা বাস্তাবায়ন করতে অবশ্যই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করতে হবে। বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, তামাক একটি প্রাণঘাতী পণ্য। তামাক ব্যবহারকারীর প্রায় অর্ধেক মারা যায় তামাকের কারণে। তামাকের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যা দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান প্রফেসর সোহেল রেজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধূমপানের কারণে অনেক রকমের ক্ষতি হতে পারে। যারা দীর্ঘদিন টানা ধূমপান করে তাদের ডায়াবেটিস, ফুসফুসে ক্যানসার, স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সদস্য সচিব হোসনে আলী খোন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৫ সালে প্রণয়ন হয়েছে। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে আইন আবার সংশোধন করা হয়। আইনটি আরও শক্তিশালী করতে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।