দেশে টিভি, ফ্রিজ, এসিসহ ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্যবাজারে সবচেয়ে বড় হিস্যা রয়েছে দেশীয় ইলেকট্রনিক জায়ান্ট ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির। গুণগত মান অনুযায়ী পণ্যের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতি বছরই কোম্পানিটির বিক্রি বাড়ছে। চলতি ২০২১-২২ হিসাববছরেও কোম্পানিটির পণ্য বিক্রি থেকে আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে বৈশি^ক পর্যায়ে কাঁচামালের দরবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কোম্পানির মুনাফা উল্টো কমে গেছে। এ সময় প্রশাসনিক, বিতরণ ও সুদজনিত ব্যয়ও বেড়েছে, যা মুনাফায় প্রভাব ফেলেছে।
ওয়ালটনের চলতি হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাঁচামালের দাম বাড়ায় ওয়ালটনের উৎপাদন ব্যয় ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে পণ্য বিক্রিতে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও কোম্পানিটির মোট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্টো কমে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে করে চলতি তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত সময়ে ওয়ালটনের নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।
এ বিষয়ে ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আবুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাঁচামালের দরবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেকটা বেড়ে গেছে। কিন্তু বৈশি^ক বাজারে কাঁচামালের দাম যে হারে বেড়েছে, গ্রাহকপর্যায়ে পণ্যের দাম সেই তুলনায় বাড়ানো হয়নি। মূলত বাজার ধরে রাখার জন্য প্রস্তুত পণ্যের দাম বাড়ানো হয়নি। যেহেতু আমাদের মুনাফার হার ভালো, সে কারণে কাঁচামালের দরবৃদ্ধির সাময়িক প্রভাবটি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মেনে নিয়েছে। আমরা আশা করছি, জুন প্রান্তিকে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
সম্প্রতি কম্প্রেশরের ইতালিয়ান তিনটি ব্র্যান্ড অধিগ্রহণ করেছে ওয়ালটন। ফলে বৈশি^ক পর্যায়ে ওয়ালটনের ব্র্যান্ডভ্যালু যেমন বাড়বে, তেমনি পণ্যের গুণগত মান আরও উন্নত হবে বলে জানান ওয়ালটন হাইটেকের এই প্রধান অর্থ কর্মকর্তা। তিনি জানান, কম্প্রেশর ব্র্যান্ড অধিগ্রহণের মূল্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে কম্প্রেশরের বড় রপ্তানিমুখী কোম্পানিতে পরিণত হবে ওয়ালটন। রপ্তানির পাশাপাশি দেশীয় পণ্যেও ইতালিয়ান কম্প্রেশর ব্যবহার করা হবে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি হিসাববছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ওয়ালটনের পণ্য বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৫ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এ সময় পণ্য উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ২০২০-২১ হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে ওয়ালটনের উৎপাদন ব্যয় ছিল মোট বিক্রির ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা চলতি হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে ৬৯ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে পণ্য বিক্রি বাড়লেও মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আড়াই শতাংশ কম।
শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, চলতি হিসাববছরে ওয়ালটনের প্রশাসনিক, বিক্রয় ও বিতরণ এবং সুদজনিত ব্যয়ও বেড়েছে। চলতি হিসাববছরের নয় মাসে কোম্পানিটির প্রশাসনিক ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে পণ্য বিক্রি ও বিতরণ ব্যয় বাবদ খরচ বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। ২০২০-২১ হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে ওয়ালটনের পণ্য বিক্রি ও বিতরণ ব্যয় বাবদ খরচ হয়েছিল ৩৩১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা চলতি হিসাববছরের একই সময়ে ৫৪৩ কোটি ৮২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ সময় পরিচালন মুনাফা হয় ১ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা।
চলতি হিসাববছরে ওয়ালটনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমলেও স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে সুদজনিত ব্যয়ও বেড়েছে। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩১ মার্চে ছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। চলতি হিসাববছরের নয় মাসে কোম্পানিটি সুদবাবদ ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৩ কোটি টাকা। কর পরিশোধের পর চলতি তৃতীয় প্রান্তিক শেষে ওয়ালটনের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮১৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা।