করোনাকাল পেরিয়ে চেনা পরিবেশে ফিরছে মক্কার মসজিদে হারাম। ফলে দুই বছর পর ব্যস্ততা বেড়েছে মসজিদে হারামে নিয়োজিত নিরাপত্তা প্রহরীদের। পবিত্র কাবা এলাকায় নিয়োজিত এসব পুলিশ দায়িত্বপালনের পাশাপাশি হজযাত্রীদের সেবা করতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করেন। প্রায়ই দেখা যায়, মক্কার পুলিশরা বিভিন্ন মানবিক, হৃদয়স্পর্শী ও মমত্বপূর্ণ কাজ করেন। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
নিরাপত্তাব্যবস্থা
আয়তনের দিক থেকে এশিয়া মহাদেশের পঞ্চম ও আরব বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ সৌদি আরব। সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রভূমি, কারণ এই দেশেই অবস্থিত উম্মুল কুরা মক্কা মোকাররমা। যেখানে রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ইবাদতগৃহ ও আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা। যা সমগ্র মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে মহান আল্লাহ কোরআন মাজিদে ঘোষণা করেছেন। এই কাবার দিকে ফিরেই সারা বিশ্বের মুসলিমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। এখানে বছরে একবার হজপালন ও সারা বছর ওমরাহ পালন করেন মুসলমানরা।
যেহেতু মক্কা নগরী কোরআন মাজিদ অবতরণের স্থান, নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কর্মক্ষেত্র। সৌদি আরবে প্রতিবছর লাখ লাখ হজ ও ওমরাহকারী গমন করেন। সংগত কারণে সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে সৌদি আরবের প্রতি। সৌদি সরকারও প্রতিবছর হজ-ওমরাহ পালনকারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে দিন দিন বাড়ছে হজ-ওমরাহকারীর সংখ্যাও।
মক্কার মসজিদে হারামের নিরাপত্তায় তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করেন কয়েক হাজার কর্মী। তারা মসজিদের ভেতর ও বাইরের সার্বিক নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি সামলানো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ পরিষেবা প্রদান করেন। আরব নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, মসজিদে হারামে আগত মুসল্লি ও ওমরাহযাত্রীদের নানা ধরনের সেবা দিতে দুই হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী এক শিফটে কাজ করেন। তারা মুসল্লিদের নানা ধরনের সেবা দেন। তাদের সেবার মধ্যে রয়েছে, মসজিদে হারামের ভেতরে ও বাইরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্মাণকাজের স্থান, নামাজের সময় ইমামদের সঙ্গে অবস্থান, নামাজের কাতার ঠিক করা, নামাজের স্থানে নির্ধারিত ওমরাহযাত্রীদের তত্ত্বাবধান করা, মসজিদের সব স্থান ও লিফটকে ভিড়মুক্ত রাখাসহ মুসল্লিদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান। মসজিদে হারামে নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষীদের আলাদা আলাদা পোশাক রয়েছে। যারা খাকি পোশাকের তারা পুলিশ, অন্যরা এলিট রয়েল ফোর্সের সদস্য।
নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা
প্রায় দেশেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষকে নানা কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর উল্টোটাও রয়েছে। যেমন সৌদি আরবের মসজিদে হারামের বিস্তৃত অঙ্গন। বলা হয়, বিশ্বের একমাত্র এই জায়গা সারাক্ষণ জাগ্রত থাকে, ভিড় থাকে নানা বর্ণের মানুষের। বিশ্বের প্রায় দেশ থেকে আগত হজ-ওমরাহপালনকারীদের ভাষা ও আচার-আচরণের ভিন্নতা সত্ত্বেও জিয়ারতকারীরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে হজ-ওমরাহর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। এক্ষেত্রে মসজিদে হারামের নিরাপত্তারক্ষীদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।
শুধু মসজিদে হারাম নয়, মদিনার মসজিদে নববিসহ হজ-ওমরাহর আনুষ্ঠানিকতা পালনের জায়গাগুলোতে ভিন্ন ভাষাভাষী হয়েও এসব স্থানে নিয়োজিত পুলিশ কিংবা নিরাপত্তারক্ষীদের দ্বারা উপকৃত হওয়ার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। আগত মুসল্লিদের ইবাদত-বন্দেগির জন্য মনোরম পরিবেশ তৈরি করতে জমজমের শীতল পানি বিতরণ এমনকি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাজেও এসব নিরাপত্তারক্ষী কাজ করেন। এই পুলিশদের তৎপরতায় বহু বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে, হারিয়ে যাওয়া শিশু সন্ধান পেয়েছে তার বাবা-মায়ের। মসজিদে হারামের সর্বত্র নিয়োজিত রয়েছে নিরাপত্তারক্ষীরা। আপনি যে ভাষারই লোক হোন, যে দেশের নাগরিকই হোন, যেকোনো সময়ই হোকনির্দ্বিধায় তাদের কাছে পরামর্শ কিংবা সহায়তা চাইতে পারেন। প্রায়ই দেখা যায়, শুধু কর্তব্য পালন নয়নিজ দায়িত্বের বাইরে মানবিকতার খাতিরে হজ-ওমরাহ পালনকারীদের সেবায় নিজেকে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত রাখছেন তারা।
প্রখর রোদে ছাতা হাতে
চলতি বছরের মার্চ মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পবিত্র কাবার কাছে তাওয়াতের স্থানে প্রখর রোদে নামাজ পড়ছে ছোট্ট একটি মেয়ে। আর মসজিদে হারামে নিয়োজিত এক নিরাপত্তাপ্রহরী মেয়েটির জন্য ছাতা ধরে রেখেছেন। প্রার্থনারত একটি ছোট্ট মেয়ের জন্য নিরাপত্তারক্ষীর এমন মানবিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।
নিরাপত্তাপ্রহরী শিশুটিকে প্রখর রোদের মাঝে নামাজ আদায় করতে দেখে নিজে থেকেই ছাতা ধরেছিল। নামাজ শেষ করে ওই গার্ডকে অভিবাদন জানাতে দেখা গেছে মেয়েটিকে। নিরাপত্তাপ্রহরী এবং ওই মেয়ের পরিচয় জানা যায়নি, তবে নেটিজেনরা এমন মহৎ কাজের জন্য তাকে সম্মান জানানোর জন্য কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে
ঘটনাটি ২০১৭ সালের। সেবার নিজের জীবন বিপন্ন করে ইহরাম পরিহিতি এক হজযাত্রীর জীবন বাঁচিয়ে এক নিরাপত্তা প্রহরী খবরের শিরোনাম হন। পরোপকারের নজির সৃষ্টিকারী ওই নিরাপত্তাপ্রহরী তার সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। তার নাম বানদার আল জাহানি। তিনি হজের সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন আরাফাতের ময়দানের কাছে।
দায়িত্বপালনকালে তিনি দেখেন, একজন বয়স্ক হজযাত্রী এলোমেলোভাবে রাস্তা পার হচ্ছেন কোনো নিয়ম না মেনে। এমন সময় দ্রুতগামী একটি বাস তাকে চাপা দিতে যাচ্ছিল, তখন তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেন। চালক বাস থামানোর চেষ্টা করলেও পুরোপুরি থামার আগেই তা নিরাপত্তারক্ষীর পা পিষে দেয় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। আহত নিরাপত্তারক্ষীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নিজের জীবন বিপন্ন করে এক বয়স্ক হজযাত্রীকে উদ্ধারের ঘটনায় মক্কার গভর্নর তাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন। এখনো সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য আল জাহানির নাম উচ্চারিত হয়।
নিজের জুতা পরিয়ে
সৌদি আরবে পবিত্র হজপালন করতে যাওয়া এক নারী হজযাত্রী জুতা হারিয়ে রাস্তায় পাওয়া বোর্ড পায়ে বেঁধে হাঁটছিলেন। রাস্তায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য বিষয়টি খেয়াল করেন। পরে নিজের পায়ের জুতা খুলে ওই নারীকে পরিয়ে দেন তিনি। ঘটনাটি ২০১৮ সালের হজের সময়কার। পুলিশ সদস্যের এমন হৃদয়স্পর্শী আচরণের ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। পরে সৌদি আরবের মূলধারার গণমাধ্যমে এটা নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়।
দৈনিক আল বায়ান সূত্রে জানা যায়, এক বৃদ্ধ দম্পতি মসজিদে হারাম থেকে জোহরের নামাজ পড়ে বের হন। তাদের থাকার জায়গা মক্কার কুদাই এলাকায়, যা মসজিদে হারাম থেকে বেশ দূরে। নামাজের পর বৃদ্ধ নারী তার জুতা হারিয়ে খালি পায়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করেন। কয়েক কদম যাওয়ার পর, রাস্তার গরমে ওই নারী বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। এটা সহ্য করতে না পেরে তার স্বামী তার স্ত্রীর পায়ে রাস্তার পাশে পাওয়া কাগজের বোর্ড রশি দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন। তখন কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ দৃশ্যটি লক্ষ্য করে তার জুতা খুলে বৃদ্ধ মহিলাকে পরিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানবিকতা ও সহানুভূতির এমন দৃশ্য দেখে অনেকেই ওই পুলিশ কর্মকর্তার দয়ালু কাজের ব্যাপক প্রশংসা করেন। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় জানা যায়নি।
বাবা-মায়ের কোলে হারানো শিশু
এই ঘটনাটি এ বছরের গত ২৯ এপ্রিলের। সৌদি আরবে তখন ২৮ রোজা। মসজিদে হারামের মাতাফের কাছে ছোট্ট জটলা একটি শিশুকে ঘিরে। ইহরামের পোশাক পরিহিত ওই শিশু কাঁদছে ওমরাহ পালন করতে আসা বাবা-মাকে হারিয়ে। তার কাছে এমন কিছুই নেই, যা দিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। শিশুটি রিয়াদ থেকে এসেছে। আর তাকে সান্ত¡না দিতে ব্যস্ত রয়েল ফোর্সের একাধিক সদস্য। তারা শিশুটিকে আশ্বস্ত করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে। এক পর্যায়ে তাকে একটি উঁচু স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, যাতে তার বাবা-মা শিশুটিকে দেখতে পান। এর ফাঁকে তাকে খাবার দেওয়া হয়, হাসি-খুশিতে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হয় গল্প বলে। মসজিদে হারামের নিরাপত্তাকর্মীদের এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
একজন নিখোঁজ শিশুর যত্ন নেওয়া, তাকে পিতামাতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা, শিশুর প্রতি নিরাপত্তাকর্মীদের এমন সহানুভূতি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন নিরাপত্তাপ্রহরী বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন ওই শিশুকে খাওয়াচ্ছেন। তার সঙ্গে কথা বলে বাবা-মা হারানোর বেদনা ভোলাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। নিখোঁজ শিশুকে এমন ভালোবাসা দিয়ে সৌদি নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা শুধু হজযাত্রী ও তাদের সন্তানদের রক্ষাই করছেন না, তারা মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও পালন করছেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছ হস্তান্তর করা হয়। এই পুরোটা সময় নিরাপত্তাপ্রহরীরা শিশুটির যতœ নেয়।
জনশূন্য মক্কায় কবুতরের আহার
পবিত্র হজ কিংবা ওমরাহপালনের সুবাদে মক্কার মিসফালা এলাকা সবার কাছে বেশ পরিচিত। মক্কা নগরীর অন্য এলাকার তুলনায় স্থানটি সমতল হওয়ায় বাংলাদেশিদের কাছে প্রিয়। তা ছাড়া মিসফালায় রয়েছে বাংলাদেশি খাবারের হোটেল, কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার সুবিধা। মসজিদে হারামের কাছে বিশাল জমজম টাওয়ারের (ক্লক টাওয়ার) পেছনের এলাকার নামই মিসফালা।
মিসফালায় ইবরাহিম খলিল রোডের শেষ অংশে ছোট্ট মাঠের মতো একটি খোলা জায়গা রয়েছে। সেখানে দিনের বেলা প্রায় সবসময় অসংখ্য কবুতর থাকে। এসব কবুতর কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানে না। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের জালালি কবুতরের মতো। কবুতরের বিচরণ ভূমি হিসেবে ওই জায়গার নাম হয়েছে কবুতর চত্বর বা কবুতরের মাঠ।
তাওয়াফ কিংবা নামাজের জন্য কাবা শরিফে আসা-যাওয়া করা হাজীরা কবুতরগুলোর জন্য গম বা খাবার কিনে ছিটিয়ে দেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, কবুতর চত্বরসহ এর আশেপাশের এলাকায় কবুতরের রাজত্ব চললেও তারা মসজিদে হারামের দিকে যায় না। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করে হাজীরা, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। এসব কবুতর তখনও থাকে নির্বিকার, শুধু একটু উড়ে জায়গা বদলায়। কোনো কোনো সময় কাবার জামাত এ এলাকা পর্যন্ত চলে আসে। নামাজেও কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না কবুতরের ঝাঁক। তাদের ওড়াউড়ি কিংবা বাক-বাকুম আওয়াজ হজযাত্রীদের প্রচুর আনন্দ দেয়।
এসব কবুতর কেউ খান না। তাদের ধরারও চেষ্টা করা হয় না। মক্কার লোকজন তাদের বাসা-বাড়ি কিংবা হোটেলের বাইরে কাঠ দিয়ে বিশেষ ধরনের খাঁচা বানিয়ে রেখেছে। রাতে ওই স্থানে কিংবা পাহাড়ে চলে যায় কবুতরগুলো।
‘দানা লে লো, দানা লে লো,’ ‘দানা দানা, খামছা রিয়াল’ বলে ডেকে ডেকে কবুতর চত্বরে আফ্রিকান ও পাকিস্তানি অনেকে প্যাকেটে করে কবুতরের জন্য বিক্রি করেন গম, যব ও ভুট্টা প্যাকেট। এক দানা (প্যাকেট) তিন রিয়াল, দু’দানা পাঁচ রিয়াল। হজপালনকারীরা এসব কিনে পরম মমতায় খাইয়ে থাকেন কবুতরগুলোকে। অনেকে বিভিন্ন মান্নত করেও কবুতরকে খাওয়ান। তবে বেশিরভাগ মানুষ শখের বশেই খাওয়ান। অনেকে আবার কুসংস্কারবশত কবুতরের খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণের নিমিত্তে।
করোনার কারণে যখন মক্কায় নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া আর কোনো মানুষ ছিল না। কারফিউর কারণে ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। তখন কবুতরগুলোকে নিয়মিত খাবার দিত মক্কার নিরাপত্তারক্ষীরা। সৌদি আরবের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনই কিছু ছবি ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, মক্কার এক নিরাপত্তারক্ষী পরম মমতা ও উচ্ছ্বাসে কবুতরদের খাবার দিচ্ছেন।
মক্কার বৈশিষ্ট্য
উপরোক্ত ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। নাড়া দিয়েছে মানুষের বিবেককে। কিন্তু বাস্তবতা হলো মক্কা-মদিনা ও মাশায়েরে মোকাদ্দাসায় (আরাফাত-মিনা-মুজদালিফা) নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রায় সবাই এমন। কারণ, এসব স্থানে নিরাপত্তার দায়িত্বে যাদের নিযুক্ত করা হয়, তাদের বিশেষভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়। নিয়োগের আগে তাদের বেশকিছু বিষয় দেখে নেওয়া হয়। মানসিকতা, চাপ সামলানোর দক্ষতা, দায়িত্ব পালনের ক্ষিপ্রতা এবং তারা শারীরিকভাবে উপযুক্ত কিনা? সর্বোপরি এখানকার তাপ ও মানুষের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা আছে কিনা? এসব এলাকায় নিয়োজিত পুলিশরা যেমন ধৈর্যশীল হয়, তেমনি তাদের হৃদয় থাকে মানবিকতায় পূর্ণ।
তাই তো দেখা যায়, স্বেচ্ছায় পিঠে বহন করে অসুস্থ কোনো হজযাত্রীকে তাওয়াফ করাচ্ছেন, মিনায় কংকর নিক্ষেপ করতে সাহায্য করছেন, ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বাবা-মাকে সহায়তা করছেন, ব্যাগ বহন করে দিচ্ছেন, গরমের সময় পানি বিতরণ ও ছিটিয়ে প্রশান্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পরম মমতায় বিড়ালকে জমজমের পানি পান করাচ্ছেন। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হাজীর পা টিপে দিচ্ছেন। এসব কাজ করার জন্য কোনো তাগাদা নেই। এগুলো তারা করেন নিজের ইচ্ছায়, মনের আনন্দে।
প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ হজ ও ওমরাহ পালন করতে পবিত্র মক্কায় যান। সৌদি আরবের রাজনীতি, সৌদি বাদশা কিংবা যুবরাজের নানা সিদ্ধান্ত, কর্মকা- ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু কোনো হজ-ওমরাহকারী মসজিদে হারামে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিতদের আন্তরিকতা, দায়িত্বপালনে সচেতনতা ও মানবিকতা নিয়ে কথা বলতে পারবেন না। এটাই যেন মক্কা নগরীর বৈশিষ্ট্য।