পাঁচগুণ বেশি মৃত্যুর নথি চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু সরকারি হিসাবের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এমন তথ্য সত্য নয় বলে জানিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ডব্লিউএইচওর এই তথ্য আনুমানিক। আনুমানিক তথ্যের কোনো বাস্তব প্রেক্ষাপট নেই। সরকারিভাবে করোনায় মৃত্যুর যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সেটাই প্রকৃত তথ্য। বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু অন্য দেশের তুলনায় প্রকৃতই অনেক কম।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এমনও বলেছেন, ডব্লিউএইচওকে পাঁচগুণ বেশি মৃত্যুর ডকুমেন্ট দেখাতে হবে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত না হয়ে আনুমানিকভাবে কোনো তথ্য গ্রহণ করা হবে না।

এমনকি দেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডব্লিউএইচওর গবেষণার ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মন্তব্য করেছেন, গবেষণায় অনেক সূচক ব্যবহার করা হয়নি। তারা (ডব্লিউএইচও) নিজেদের মতো একটা ফর্মে গবেষণা করেছে। 

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর গতকাল শুক্রবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মনে করি যে, আমরা সরকারিভাবে যে রিপোর্ট দেই, সেটা কনফার্ম কেস। অনুমাননির্ভর কেস আমরা গ্রহণ করব না। কারণ, এটা প্রমাণ করা যাবে না। তারা (ডব্লিউএইচও) যে রিপোর্ট দিচ্ছে, সেটার ব্যাখ্যা তাদেরই দিতে হবে। তারা ডকুমেন্ট দেখাক, কোনো সমস্যা নেই। রবিবার (আগামীকাল) অফিস খুললে ওদের (ডব্লিউএইচও) সঙ্গে কথা বলতে পারি। সবকিছু চিন্তা করেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

এর আগে গত ১০ মার্চ এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেটও দাবি করেছিল, করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে মোট মৃত্যু সরকারি মৃত্যুর হিসাবের প্রায় ১৫ গুণ বেশি। জার্নালটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরে বাংলাদেশে করোনায় মোট মারা গেছে ৪ লাখ ১৩ হাজার জন। কিন্তু সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২৮ হাজার ১০০ জন।

ডব্লিউএইচওর মতো ল্যানসেটের দেওয়া করোনায় মৃত্যুর তথ্যকেও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছিলেন সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সে সময়ও কর্মকর্তারা বলেছিলেন, করোনাকালীন সময়ে শনাক্তের বাইরে করোনা উপসর্গ নিয়ে যে সংখ্যক মানুষ মারা গেছে, সেটা করোনায় মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশের বেশি নয়। সে হিসাবেও ল্যানসেটের তথ্যের সঙ্গে মেলে না। ল্যানসেটের এই গবেষণা পর্যালোচনা করতে হবে। ঢালাওভাবে মন্তব্য করাটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

বাংলাদেশের ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে উঠে আসা করোনার মৃত্যুর হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারত সরকার। বলেছে, প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে। তবে করোনায় প্রকৃত মৃত্যু নিয়ে করা অন্য গবেষণাগুলোতেও মোটামুটি একই তথ্য উঠে এসেছে।

অনুমাননির্ভর কেস গ্রহণ করবে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর : অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ মৃত্যু হয়েছে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায়, সে তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যু অনেক কম এটা তাদের (ডব্লিউএইচও) বিশ্বাস হচ্ছে না। বাংলাদেশে করোনায় প্রকৃতই মৃত্যু কম। গণমাধ্যম খোঁজ নিয়েছে, মাঠে ছিল। এখানে লুকানোর কিছু নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদি বলে ৫-৬ গুণ, সেটার ডকুমেন্ট দেখাতে হবে। কারণ একজন রোগী যদি কভিডে মারা যায়, সেটা আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় নিশ্চিত না হয়ে অনুমান থেকে বলা যাবে না। সেক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি কনফার্মেশন রিপোর্ট লাগবে। কেউ যদি অনুমান থেকে বলে, তাহলে তাদের কাছে এক রকম মনে হবে, আমাদের কাছে আরেক রকম মনে হবে। এখানে ফারাক থাকবেই।

ডব্লিউএইচওর তথ্য সত্য নয় : করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ডব্লিউএইচও যে তথ্য দিয়েছে, সেটা সত্য নয় বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে সরকারি যে হিসাব, তার থেকে খুব বেশি হলে ২-৫ শতাংশ মৃত্যু বেশি হতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছে যারা হাসপাতালে আসেনি, মৃত্যু বা আক্রান্তের তথ্য দেয়নি। এই হিসাব করলেও দেড়শ মৃত্যু বেশি হবে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে পাঁচগুণ বলছে, সেটা সত্য নয়। এত মৃত্যু হলে সবাই টের পেত।

এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, হু বলেছে করোনার সময় করোনা রিলেটেড বা অনরিলেটেড যত মৃত্যু হয়েছে, হাসপাতালে যেতে পারেনি, অন্য রোগে বাসায় মারা গেছে, সেগুলোর একটা আনুমানিক তথ্য দিয়েছে। করোনার সময় অন্য রোগে মারা গেলে, সেটা কেন করোনায় মৃত্যু হবে? এসব মৃত্যুর সঙ্গে করোনার কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে প্রতিদিন বিভিন্ন রোগে ও সাধারণভাবে গড়ে ২ হাজার ৫৮৮ জন মারা যায়। সে হিসাব তো করোনায় আসবে না। সাধারণত অনুমাননির্ভর মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয় মহামারীর শেষে। এখনো তো মহামারী শেষের কোনো লক্ষণ নেই।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশে যে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো, গ্রাম পর্যন্ত যে স্বাস্থ্য সুবিধা, গ্রামে একজন করে স্বাস্থ্যকর্মী থাকে। এরকম পাঁচগুণ বেশি মৃত্যু হলে দেশের মধ্যেই ব্যাপক হইচই হতো। এত মানুষ মরলে রাস্তাঘাটে লাশ পড়ে থাকত। আর ন্যাচারাল ডেথ ও ননকমিউনিকেবল ডেথ করোনার সময় মারা গেছে বলেই যে সব করোনার কারণে মারা গেছে, সেটার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এ ছাড়া এর আগে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন যে তথ্য দিয়েছিল, সেটার সঙ্গে এটার (ডব্লিউএইচও) মিল নেই বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনেক গবেষণা হবে। দেখা যাবে, একটা সময় বেটার ফিগার পাওয়া যাবে।

ডব্লিউএইচওর গবেষণার ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. এ এস এম আলমগীর। তিনি বলেন, গবেষণায় দ্ুিট প্রক্রিয়া ব্যবহারই করা হয়নি। যেমন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ। কতগুলো সূচক ধরে নিজেদের মতো একটা ফর্মুলা ধরে এসব তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এটা একটা গবেষণা ঠিক আছে। কিন্তু এটার অর্থ এই নয় যে, দিজ ইজ দ্য ট্রু রেজাল্ট। এটা একটা গবেষণার ফলাফল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সত্য নয়। এটা সবাই জানে। খোলা চোখে দেখলেও সবাই বুঝতে পারে যে তারা (ডব্লিউএইচও) যে হিসাব দিচ্ছে, অত মৃত্যু এখানে হয়নি।

আইইডিসিআরের এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, গবেষণায় মৃত্যু নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটা অনুমাননির্ভর তথ্য। সোয়াইন ফ্লুর সময় বাংলাদেশে আটজন মারা গেছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সারা পৃথিবীতে ল্যাবরেটরির কনফার্ম ডেথ হলো ১৫ হাজার ৯ জন ও ইসটিমিটেড ডেথ হলো ৩-৪ মিলিয়ন। আনুমানিক তথ্যের সঙ্গে কনফার্ম কেসের বিস্তর ফারাক থাকবেই। সুতরাং আনুমানিক তথ্যের কোনো বাস্তব প্রেক্ষাপট নেই।

হিসাবের গরমিলে শীর্ষে মিসর, ভারত ও পাকিস্তান : ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে কভিড-১৯-এ মোট মৃত্যু দেশগুলোর সরকারের প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে তিনগুণ বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে দেশে সরকারিভাবে যত মৃত্যুর সংখ্যা জানানো হয়েছে, প্রকৃত মৃত্যু তার চেয়ে ৯৫ লাখ বেশি। প্রকৃত মৃত্যু হয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ। এই সময়ে সরকারিভাবে বিশ্বব্যাপী করোনায় মৃতের সংখ্যা ৫৪ লাখের কিছু বেশি ছিল। সরকারিভাবে ১০ হাজারের বেশি মৃত্যু দেখানো হয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে মিসরে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ১১ দশমিক ৬ গুণ বেশি। এরপর ভারতে সরকারিভাবে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে ৯ দশমিক ৯ গুণ মৃত্যু হয়েছে ও পাকিস্তানে ৮ গুণ বেশি। এরপর সরকারি হিসাবের চেয়ে ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ১ গুণ, বাংলাদেশে ৫ গুণ, বলিভিয়ায় ৪ দশমিক ৫ গুণ, সার্বিয়ায় ৪ দশমিক ৪ গুণ, কাজাখস্তানে ৪ দশমিক ২ গুণ, ফিলিপাইনে ৩ দশমিক ৬ গুণ ও রাশিয়ায় ৩ দশমিক ৫ গুণ বেশি মৃত্যু হয়েছে।

ডব্লিউএইচও বলেছে, পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় মৃতের সংখ্যা কম এসেছে। এমনকি মহামারী-পূর্ব পরিস্থিতিতে প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে গড়ে ৬টি নিবন্ধিত হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ‘বাড়তি মৃত্যু’ হয়েছে সরাসরি কভিড-১৯ এবং অতিমারীর পরোক্ষ প্রভাবে। করোনা অতিমারী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর করোনাভাইরাসে সংক্রমিত না হওয়া রোগীরা স্বাস্থ্যসেবা পায়নি। এ কারণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মৃত্যুর কারণ অতিমারীর পরোক্ষ প্রভাব। এ ছাড়া অতিমারীর সময় যেসব মৃত্যু এড়ানো যেত, সেসব মৃত্যুও এতে যোগ করা হয়েছে। যেমন বিধিনিষেধের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় হওয়া মৃত্যু। যদিও সে সময় এসব মৃত্যুর ঝুঁকি কম ছিল।

ডব্লিউএইচও বলেছে, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি প্যানেল এ বিষয়ে বেশ কয়েক মাস ধরে কাজ করেছে। তারা সরকারিভাবে দেওয়া তথ্য ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখেছে। একই সঙ্গে তারা পরিসংখ্যানের বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করেছে। তবে ডব্লিউএইচও যে পদ্ধতি ব্যবহার করে করোনায় মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছে ভারত।