উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো পাম্পেই মিলছে না ছোট যানবাহনের জ্বালানি পেট্রল। বিকল্প হিসেবে চালকরা অকটেন ব্যবহার করায় এ জ্বালানিতেও টান পড়েছে। টাকা দিলেও পাম্পগুলো গ্রাহককে পর্যাপ্ত পরিমাণ অকটেন দিচ্ছে না। বেশিরভাগ পাম্পে ‘পেট্রল ও অকটেন নেই’ লেখা টানানো। এক সপ্তাহ ধরেই উত্তরবঙ্গে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে পেট্রল নিয়ে হাহাকার চলছে। কোনো ঘোষণা ছাড়া বিক্রি বন্ধ করায় পাম্পে এসে পেট্রলনির্ভর বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা ফিরে যাচ্ছেন।
পাম্প মালিকরা বলছেন, ঠিকভাবে তারা জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাচ্ছেন না। টাকা দিয়েও ডিপো থেকে তেল পাচ্ছেন না। পেট্রলের সরবরাহ শূন্যে আসায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। অকটেন বিক্রি করছেন স্বল্প পরিমাণে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অকটেন বিক্রিও বন্ধ করে দেবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপমহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, ‘এখন দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। সারা দেশের ডিপোগুলোতে যে পরিমাণ তেল মজুদ আছে, ব্যারেল স্টক বাদ দিয়েও অনায়াসে ১২ দিন চলবে।’
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্বতীপুর ডিপোতে যথেষ্ট পরিমাণে পেট্রল ও অকটেন মজুদ রয়েছে। তাহলে ওই এলাকার পাম্প মালিকরা কেন তেল উত্তোলন করেননি? কোন ডিপোতে গিয়ে তারা তেল পাননি, বলতে পারবেন? হয়তো তাদের ব্যাংকে টাকার ঘাটতি থাকতে পারে। এজন্য তেল ওঠাননি তারা। জিজ্ঞাসা করলে তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।’
অবশ্য চালকদের অভিযোগ, দাম বাড়াতেই জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, পাম্পে গিয়ে পেট্রল পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খোলাবাজারে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা দিলে মিলছে প্রতি লিটার পেট্রল।
রাজশাহীতে পাম্পে নেই পেট্রল : জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রল পাওয়া যাচ্ছে না। অকটেন মিলছে স্বল্প পরিমাণে। স্টেশন মালিকরা বলছেন, ঠিকভাবে তেল সরবরাহ না পাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রেখেছেন তারা। ফলে পাম্পে এসে বিপাকে পড়েছেন যানচালকরা।
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প অ্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৪৮টি পেট্রল পাম্প থাকলেও গত তিন মাস পর্যাপ্ত তেল আসছে না। ঈদের লম্বা ছুটির কারণে সংকট প্রকট হয়েছে। বেশকিছু পাম্প বর্তমানে তেলশূন্য।
শুক্র ও গতকাল শনিবার দুদিন রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ পাম্পে পেট্রল নেই। কিছু কিছু পাম্পে শুধু ডিজেল ও অকটেন আছে। তবে সেগুলো কম থাকায় ক্রেতাকে চাহিদার তুলনায় কম দেওয়া হচ্ছে। নগরীর কুমারপাড়ার গুলগোফুর পাম্পে তেল নিতে আসা অসিম সরকার বলেন, ‘আমি মোহনপুরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। পরিবার নিয়ে থাকি রাজশাহী শহরে। প্রতিদিন ৪০-৫০ কিলোমিটার মোটরসাইকেলে পাড়ি দিতে হয়। পাম্পে এসে পেট্রল পাইনি। অকটেন নিলাম, তাও যা চেয়েছি, তা দেয়নি।’
এই পাম্পের ব্যবস্থাপক আবদুর রহিম বলেন, ‘সারা দেশেই পেট্রলের সরবরাহ নেই। বৃহস্পতিবার টাকা দিয়ে এখনো (গতকাল) তেল পাইনি। কোম্পানি বলেছে, রবিবার কিছু তেল দিতে পারবে। মেঘনা কোম্পানির ডিলার আমরা। তারা বলছে, তেল নেই। ফলে আমরা পেট্রল বিক্রি বন্ধ রেখেছি। অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করছি।’
নগরীর কাশিয়াডাঙ্গার রহমান ফিলিং স্টেশন থেকে বলা হয়, কোম্পানি থেকে তাদের তেল দিচ্ছে না। আগেও চার দিন বন্ধ ছিল। টাকা দেওয়ার পর গতকাল ভোর ৪টায় অকটেন দিয়েছে, যা দিয়ে হয়তো দিনটাও পার হবে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, রাজশাহী জেলার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, ‘রাজশাহীতে তিন মাস ধরেই তেলের সংকট চলছে। আজ এই পাম্প পাচ্ছে তো কাল ওই পাম্প তেল পাচ্ছে। ঈদের লম্বা ছুটিতে সংকট বেড়েছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা আমরা জানি না। বিপিসি বলতে পারবে।’
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপমহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, তেলের কোনো সংকট নেই। পার্বতীপুর ডিপোতে পেট্রল ও অকটেন যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। পাম্প মালিকরাই তেল তোলেননি। কেন তোলেননি তারাই ভালো বলতে পারবেন।
দিনাজপুরে খোলাবাজারে পেট্রল, লিটার ১৩০ টাকা : দিনাজপুরে এক সপ্তাহ ধরে পেট্রলের জন্য হাহাকার চলছে। বাধ্য হয়ে অকটেন ব্যবহার করছেন মোটরসাইকেল চালকরা। অকটেন বিক্রি বাড়ায় অনেক পাম্পে এ জ্বালানিরও সংকট দেখা দিয়েছে।
তবে পাম্পে সংকট থাকলেও খোলাবাজারে মিলছে পেট্রল। ৮৬ টাকা লিটারের পেট্রল দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। দিনাজপুরের দিনাজপুর শহরের লিলি মোড়, সিঅ্যান্ডবি মোড়, বড়মাঠ বড়পুল, পুলহাট, পাসপোর্ট অফিস মোড়, বালুয়াডাঙ্গা, শিকদারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে খোলাবাজারে প্রতি লিটার পেট্রল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকায়।
মোটরসাইকেল চালক বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে দিনাজপুরের কোনো পাম্পে পেট্রল পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে অকটেন ব্যবহার করেছি। পরে বড়মাঠ বড়পুলের কাছে খুচরা পেট্রল কিনেছি ১১০ টাকা লিটার। এভাবে বেশি দামে কিনতে হলে বেতনের টাকা সব শেষ হয়ে যাবে।’
খুচরা তেল বিক্রেতা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমি ২৭ রমজানে পাম্প থেকে ৪০ লিটার তেল কিনেছি। দোকান পর্যন্ত আনতে খরচ হয়েছে। এজন্য প্রতি লিটার ১১০ টাকা করে বিক্রি করছি।’
সমতা পাম্পের সহকারী ব্যবস্থাপক মোফাজ্জল হোসেন স্বপন বলেন, ‘পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন ডিপোতে তেলের সংকট রয়েছে। তারা ঠিকমতো তেল সরবরাহ না করায় এক সপ্তাহ পেট্রল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।’
পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের পার্বতীপুর তেল ডিপোর উপব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. আজম খান বলেন, ‘বর্তমানে আমরা গ্যাসফিল্ড থেকে তেল কম সরবরাহ পাচ্ছি। এজন্য ডিলার ও এজেন্টদের ঠিকমতো দিতে পারছি না।’
নীলফামারীতে পেট্রল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকরা : নীলফামারীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রল ও অকটেনের সংকট প্রকট হয়েছে। তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন যানবাহনের চালকরা। ঈদের কয়েক দিন ধরে এ অবস্থা চলছে বলে জানিয়েছেন তেল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরের রাজা, সামসুল, রশিদাসহ বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে লেখা রয়েছে, ‘তেল নেই’। জেলার ৩৬টি পাম্পে তিন মাস ধরে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে।
রশিদা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল্লাহ জানান, সরবরাহ না থাকায় তারা গ্রাহককে পেট্রল ও অকটেন দিতে পারছেন না।
জেলা পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আখতারুজ্জামান স্বপন জানান, পার্বতীপুর ডিপোতে না পেয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে তেল নিয়ে পাম্প চালাচ্ছিলেন। কিন্তু এখন সেখানেও পেট্রল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
যমুনা অয়েল লিমিটেড পার্বতীপুর ডিপোর ইনচার্জ মো. আহসান বলেন, ‘আমরা খুলনা থেকে পার্বতীপুর ডিপোতে পেট্রল আনি। বর্তমানে পেট্রলের সংকট রয়েছে।’
কুড়িগ্রামে ভোগান্তিতে মোটরসাইকেল চালকরা : জেলায় পেট্রল ও অকটেন সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। গতকাল জেলা শহরের খলিলগঞ্জ এলাকার মেসার্স এসএস ফিলিং স্টেশন এবং সদর উপজেলার ত্রিমোহনী এলাকার মেসার্স সাহা ফিলিং স্টেশনে পেট্রল ও অকটেনের মজুদ শূন্যে নেমে আসায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির আওতাভুক্ত মেসার্স এসএস ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, তারা বাঘাবাড়ী, রংপুর ও পার্বতীপুর ডিপো থেকে তেল নেন। সরবরাহ না থাকায় মজুদ শূন্যে নেমে আসায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন।
মোটরসাইকেল চালক পৌর শহরের ফজলুর হক ফারাজী বলেন, ‘বেশিরভাগ পাম্পে পেট্রল নেই। সাহা ফিলিং স্টেশনে পেয়েছি, ১০০ টাকার ওপরে ছাড়া দিচ্ছে না।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী, দিনাজপুর প্রতিনিধি, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি, নীলফামারী প্রতিনিধি ও কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা।