তিন বছর পর দেনা পরিশোধে স্বস্তি থাকবে না : ড. দেবপ্রিয়

দেশের দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দায়দেনা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়ে বাড়ছে। আগামীতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। ঋণ পরিশোধ নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশের স্বস্তির জায়গা কমে আসার আশঙ্কার কথাও বলেন দেবপ্রিয়।

গতকাল সোমবার সরকারের দায়দেনা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার চাপ এবং পাশর্^বর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের আর্থিক সংকট বিবেচনায় দায়দেনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ঋণের চাপ সামলাতে তিনি সরকারকে তিনটি বার্তা দেন। প্রথমত, কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক সংহতিকরণ। দ্বিতীয়ত, বহিস্থ খাতের বর্তমান চাপ মোকাবিলায় সুরক্ষা দেওয়া এবং তৃতীয়ত, দায়দেনা পরিস্থিতির সামগ্রিক, স্বচ্ছ ও নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে দায়দেনা নিয়ে শ্রীলঙ্কা বড় সংকটে পড়েছে। এর পরিণতিতে সেখানে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও নেপালেও প্রায় একই অবস্থা চলছে। বাংলাদেশকে বিষয়টি সতর্ক পর্যালোচনার মধ্যে রাখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করতে চান না; বরং শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে তার দায়দেনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে এবং সরকারের ইতিমধ্যে যেসব নীতি বা আইন রয়েছে, সে অনুযায়ী সঠিক বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশেও একবার বিদেশি বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের একটি আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন সিপিডি থেকে আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। শ্রীলঙ্কাতেও বিদেশি ঋণের বিরোধিতা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিরোধিতাকে আমলে নেওয়া হয়নি বলেই তারা সংকটে পড়েছে।’

ড. দেবপ্রিয় ঋণ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে পাঁচটি ঝুঁকির কথা বলেন। এর একটি হলো বিনিময় হারের ঝুঁকি। বাংলাদেশে এই ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হারের ঝুঁকি বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারের ঝুঁকিও কিছুটা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। আর প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক লাভ কতটুকু হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি।

ঋণ পরিশোধের বর্তমান স্বস্তিদায়ক অবস্থাকে ‘সবুজ সংকেত’ আখ্যা দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে তা ‘হলুদ’ হতে পারে এবং অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এমন মন্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কিছু প্রকল্পে উচ্চমূল্যের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এগিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংক, জাপানসহ প্রথাগতভাবে যারা কম সুদে ঋণ দিত, তারাও এখন তুলনামূলক বেশি সুদ নিচ্ছে। সুতরাং স্বস্তির জায়গাটা কমে আসছে।

মূল প্রবন্ধে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো জানান, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে মাথাপিছু দায়দেনা অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ ৪৩২ ডলার । ঋণ হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কম হলেও ২০১৮ সালের পর থেকে দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের সার্বিকভাবে জিডিপি অনুপাতে সরকারি দায়দেনা ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এর মধ্যে এক দশকে অভ্যন্তরীণ দেনা বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৪ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ দায়দেনা ৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। ২০১৩ সালের পরে এই বৃদ্ধির হার ১৫ থেকে ১৯ শতাংশ হারে বাড়ছে।