ভাসানচরে জাতিসংঘের কাজ শুরু জরুরি

জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা ভাসানচরে কাজ শুরু করার কথা চার মাস আগে থেকে। অথচ এখনো কাজ শুরু করেনি। একথা আমরা জানি কেননা যারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন যে, ভাসানচরে জাতিসংঘের অফিশিয়াল উপস্থিতি কতটা জরুরি। জাতিসংঘ যে এখনো কাজ শুরু করেনি সেটা আমরা আন-অফিশিয়ালি জানি কিন্তু গত ১০ মে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ত্রাণ মন্ত্রাণালয়ে খোদ প্রতিমন্ত্রী যখন একথা স্বীকার করেন, তখন সেটা অফিশিয়াল হয়ে যায়। তিনি ইউএসএআইডির ডেপুটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (পলিসি অ্যান্ড প্রোগ্রামিং) ইসোবেল কোলম্যান এবং ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম)-এর প্রধান নিকোলাস কোয়াজিমানের নেতৃত্বে দু’টি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর অফিশিয়াল প্রেস ব্রিফিং-এ সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন। তবে, জাতিসংঘ কেন ভাসানচরে এখনো কাজ শুরু করেনি তার কোনো সদুত্তর আমাদের জানা নেই বা আমাদের জানানো হয়নি। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের ভাসানচর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোথাও দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। তবে, এতটুকু মোটামুটি সবাই ধারণা করতে পারেন যে, জাতিসংঘ কিছু শর্ত দিয়েছিল কিন্তু সে শর্তগুলো সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে এখনো পালন করা হয়নি।

তবে, জাতিসংঘের অন্যান্য শর্তের মধ্যে একটা ছিল ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের ফ্রি-ভাবে চলাচল করতে দেওয়া বা অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা দেওয়া যাতে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তির কথা জানানো হয়েছে। তারপর একটা অত্যাধুনিক হাসপাতাল করার কথা থাকলেও সেটা বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে এখনো নতুন করে নির্মাণ করা হয়নি। এরকম বেশ কিছু বিষয় আছে যা জনসমক্ষে সবসময় আসে না। জাতিসংঘও তাদের কূটনৈতিক শিষ্টাচার মানতে গিয়ে ‘অনেক কথা যায় যে বলে কোনো কথা না-বলে’ এরকম একটা পরিস্থিতিতে যা দাঁড়াচ্ছে তা হচ্ছে ভাসানচরে জাতিসংঘের কাজকর্ম শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। আর এ বিলম্ব আখেরে বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে বলে আমি মনে করি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভাসানচর প্রকল্পের শুরু থেকেই আমরা বিভিন্ন মহলে নানান ধরনের বিতর্ক দেখতে পাই। এটার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কোনো পর্যায়ে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত না-করা। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করা প্রায় ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গার মধ্য থেকে মাত্র এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং সে লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু কেন এবং কোন বিবেচনায় জাতিসংঘকে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা কোনো পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে কি-না আমার জানা নেই। কিন্তু শুরু থেকে পুরো স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা থাকলে অনেক বিতর্ক এড়ানো যেত বলে অনেকে মনে করেন। এছাড়াও ৫টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার সংস্থা ভাসানচর ভিজিট করার অনুমতি চেয়েছিল কিন্তু সে অনুমতিও দেওয়া হয়নি। কেন অনুমতি দেওয়া হয়নি সেটাও এখনো সর্বসাধারণের কাছে অজ্ঞাত। রোহিঙ্গাদের রাখার জন্য ভাসানচরে যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে ভাসানচর ভিজিট করতে দিলে ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি হতো বলে আমি মনে করি। কিন্তু তাদের ভিজিট করতে না-দেওয়ার কারণে ভাসানচর ঘিরে যে বিতর্ক সেটা আরও জোরালো হয়। এদিকে ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা রীতিমতো প্রেস কনফারেন্স করে সবাইকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।

মূল বিতর্কটা ছিল, ভাসানচর মানুষের জন্য বাসযোগ্য কিনা। এটার বয়স যেহেতু মাত্র ২০ বছর এবং এর আগে এ চরে যেহেতু কোনো মানুষের বসতি ছিল না, সেহেতু এ চরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর তাদের নতুন করে জীবনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে কি-না। কিন্তু যখন সরকার সত্যি সত্যি স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করে তখন দেখা যায়, সেই স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে এবং সুপরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবং দেশি ও বিদেশি মিডিয়াতে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা করা হয়েছে। তখন নতুন সমালোচনা সামনে আসে যে, রোহিঙ্গাদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার দাবি করছে, এটা হচ্ছে স্বেচ্ছা স্থানান্তর কিন্তু সমালোচকরা এটাকে জোরপূর্বক স্থানান্তর হিসেবে উপস্থাপনার চেষ্টা করে গোটা স্থানান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। কিন্তু যারা ভাসানচরে স্থানান্তরিত হয়, তারা গোটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে একধরনের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। শুরুতেই ২২টা বেসরকারি সাহায্য সংস্থা যৌথভাবে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪০টা বেসরকারি সাহায্য সংস্থা কাজ করছে। এসব বিতর্কের পরেও ভাসানচরে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যারা ভাসানচরে স্থানান্তরিত হয়েছে তাদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাতে সব ধরনের সমালোচনার জবাব দেওয়া যায় এবং উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদেরও ভাসানচরে স্থানান্তরের ব্যাপারে উৎসাহিত করা যায়। কিন্তু দেখা গেল নতুন সমস্যা। রোহিঙ্গারা দলে দলে ভাসানচর থেকে পালাতে শুরু করে। নানান অসন্তুষ্টি তাদের মধ্যে তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় যায় যে, রোহিঙ্গাদের অনেকে বিদেশি ডেলিগেটদের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কেন রোহিঙ্গাদের মধ্যে এরকম অসন্তুষ্টি শুরু হয় তা নিয়েও নানান বিতর্ক আছে। যেমন যাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাদের অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু স্থানান্তরিত হওয়ার পরে দেখা গেছে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। আবার, অনেকে ভাসানচরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে উখিয়া-টেকনাফে অবস্থিত আত্মীয়, পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আবার অনেকে মনে করে যে, তারা জনমানবহীন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। তাদের চলাচলের কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নেই। এরকম নানান ধরনের অসন্তুষ্টির কথা ভাসানচরে স্থানান্তরিত হওয়া রোহিঙ্গারা নানানভাবে মিডিয়াতে প্রকাশ করে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল পরিবারপিছু আড়াই কানি (এক একর) জমি দেবে, চাষবাস করে জীবন চলবে। এক জোড়া গরু-মহিষ দেবে।  যতদিন চাষবাস করতে না-পারছি, ততদিন সরকার খাওয়াবে। তারপর বলেছিল ঋণ দেবে, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারি।’ কিন্তু সরকার কোনো কথা রাখেনি। (দেখুন, বিবিসি বাংলা অনলাইন, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১)। এরকম নানান অভিযোগ আমরা আমাদের গবেষণায়ও পেয়েছি আবার মিডিয়ায় দেওয়া রোহিঙ্গাদের বক্তব্য থেকেও জেনেছি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে দফায় দফায় মিটিং-এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘকে কনভিন্স করানো এবং ভাসানচরে কাজ করতে রাজি করানো। এবং এটা সরকারের সফলতা নিঃসন্দেহে। এতে করে ভাসানচরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে যেমন একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে, তেমনি উখিয়া-টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যেও ভাসানচরে স্থানান্তরিত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হবে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ভাসানচর নিয়ে অনেক ভুল ধারণা এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর হবে। তাই, যত দ্রুত সময়ে জাতিসংঘ যাতে বাসানচরে কাজ শুরু করে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং তার জন্য যা যা করণীয়, সেটা করতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং ডাব্লিওএফপি কাজ শুরু করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়