দেশীয়ভাবে ভোজ্য তেল উৎপাদনের বিকল্প নেই

বৈশ্বিক মহামারী করোনার ছোবলে টানা দুই বছরের অধিক সময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের স্বাভাবিক রুটি-রুজির দুরবস্থা এখনো অনেকাংশেই বিদ্যমান। এরই মধ্যে ভোজ্য তেলের উপর্যুপরি মূল্যবৃদ্ধিসহ কম-বেশি সব নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে আজ বিপর্যস্ত জনজীবন। দাম কমার কোনো সুবাতাস নেই। উল্টো দিন দিন সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষেও যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ৫ মে ‘বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’ সয়াবিন ও পাম অয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলন করে। এক লাফে সয়াবিনের মূল্য প্রতি লিটারে ৩৮ টাকা ও পাম অয়েলের প্রতি লিটার ৪২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের বাজার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করার কারণে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এটাও সত্য রাশিয়া, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বেই সয়াবিন, সানফ্লাওয়ার পাম অয়েলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অতিসম্প্রতি পাম অয়েলের প্রধান উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সে অজুহাতে ভোজ্য তেলের বাজার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।

বাস্তবে আমাদের দেশে কোনো না কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ে। আর একবার দাম বাড়লে তা আর কমে না। আর সেই সুযোগ একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ভোক্তার গলা কাটে। এটা যে শুধু ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে তা নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপকৌশলের সুযোগে নেওয়া হয়। তবে কমাস ধরে ভোজ্য তেলের অস্থির বাজার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সে সুযোগে হাতে গুনা কটি শিল্প গ্রুপ সাধারণ ভোক্তার পকেট কেটে ফুলে-ফেঁপে আরও কলাগাছ হচ্ছে। দেখুন, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল আমদানি করা কিন্তু বন্ধ নেই। ভোজ্য তেল আগের দরে আমদানি অব্যাহত রয়েছে। আমদানি করা এসব ভোজ্য তেল দেশে আসার পর রিফাইন করে বর্তমানের বাড়তি দরে আমদানিকারকরা বিক্রি করবেন। ফলে প্রতি লিটার সয়াবিনে ৩৮ টাকা ও পাম অয়েলে ৪২ টাকা বেশি দরে বিক্রি করলে কী পরিমাণ লাভবান হবেন, যা বুঝতে কারও কষ্ট হবে না। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ‘এমভি ওরিয়েন্ট চ্যালেঞ্জ’ নামে একটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ২ কোটি ২৯ লাখ লিটার অপরিশোধিত সয়াবিন তেল নিয়ে গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। পাশাপাশি ১৩ হাজার টন পাম অয়েলবাহী ‘এমটি সুমাত্রা পাম’ জাহাজটি গত ৬ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এ তথ্য নিশ্চিত করে ২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব উমর ফারুক বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে তেল নিয়ে গত ৫ মে একটি জাহাজ ভিড়েছে। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় চারটি কোম্পানি আমদানি করা তেলের খালাস প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, দেশের শীর্ষ আমদানিকারকরা ইন্দোনেশিয়ান সরকারের নিষেধাজ্ঞার আগেই এপ্রিল মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন পাম অয়েল আমদানি করেছে। বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টন পাম অয়েল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে, আর বাকি ১০ শতাংশ আমদানি হয় মালয়েশিয়া থেকে। দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টনের বেশি ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। দেশীয়ভাবে মাত্র যৎসামান্য ভোজ্য তেল উৎপাদন হলেও বাকিটার পুরো অংশই আমদানিনির্ভর। ফলে ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানি বন্ধ করায় এ সংকট আরও ঘনীভূত হতে পার বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মূলত যেকোনো রাষ্ট্র জনস্বার্থে যেকোনো পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানি করে থাকে। আবার জনস্বার্থেই আমদানি-রপ্তানি বন্ধও রাখে। এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক অবস্থাকে আমলে নিয়ে দেশীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ না করলে স্থানীয়ভাবে সংকট নিরসন করার কোনো সুযোগ থাকে না। আমাদের দেশটি কৃষিনির্ভর। আর ভোজ্য তেল উৎপাদনের কাঁচামাল সয়াবিন, সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষাবাদ বৃদ্ধি করা গেলে পর্যায়ক্রমে এ সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেশে ভোজ্য তেলের কাঁচামাল উৎপাদনের অনেক সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকার পরও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাব ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দেশে ভোজ্য তেলের কাঁচামাল সয়াবিন, সূর্যমুখী ও ভুট্টার চাষাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অথচ হাওর ও চরাঞ্চলে এখন ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী ও সয়াবিনের চাষাবাদ করা সম্ভব। এটাই পুঁজিবাদী একটি রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র। যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে শ্রেণিস্বার্থে গুটিকয়েক শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না। উল্টো দিন দিন চাহিদার বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা বেড়েই চলছে। ফলে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ নদীমাতৃক বাংলাদেশের কমবেশি সব নদীতে বিশাল বিশাল চরের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে সয়াবিন ও ভুট্টার ব্যাপক চাষাবাদ করা সম্ভব। শুধু উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনার শত সুযোগ আঁতুড় ঘরেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

তবে স্বস্তির খবর সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার মুরাদনগরে ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টিতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার ও বীজ প্রণোদনার মাধ্যমে চাষ শুরু করেছে সূর্যমুখী ফুলের। প্রথমবারেই ফলন ভালো হওয়ায় চাষিরা দারুণ খুশি। শুধু কুমিল্লায় নয়, হাওরখ্যাত সুনামগঞ্জ এলাকায় এখন ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী ফুলের চাষাবাদ শুরু হয়েছে। সূর্যমুখী ফুল থেকে তেল, খৈল ও জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে ১০ মণ বীজ উৎপাদন হয়, যা থেকে প্রায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল পাওয়া যায়। এখন এসব প্রতি লিটার তেলের বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ টাকা, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য এ তেল অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। যে কারণে সরকার যদি সূর্যমুখী, সয়াবিন, সরিষার চাষাবাদে প্রণোদনা দিয়ে পুরো দেশেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যাপক পরিকল্পনার ভিত্তিতে তেলবীজের চাষাবাদ বৃদ্ধি করে তাহলে ভোজ্য তেলের উপযোগী ফসল চাষাবাদ করে দেশীয় চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।

বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশে অমিত সম্ভাবনার দ্বারগুলো শুধু গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে সেভাবে গ্রহণ করা হয় না। অথচ বিদেশ থেকে প্রতি বছরই মানুষের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোজ্য তেল আমদানি করা হচ্ছে। আর দুর্নীতি তো ভালোভাবে বাসা বেঁধে বসেছে। শ্রেণিস্বার্থ থাকলে দুর্নীতি থাকবে, আর দুর্নীতি থাকলে জনস্বার্থ, উন্নয়ন সবই পিছিয়ে পড়বে। কারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো অপূর্ণ রেখে ইমারত বানানোকে প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন বলা যাবে না। প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। তা না হলে হয়তো গুটিকয়েক মানুষ ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ হবে, রাস্তা, ঘাট, নগরায়ণের জৌলুশ বাড়বে সত্য, কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকা হবে অতিকষ্টের। যা ক্ষমতাসীনরা বুঝতে চান না। যাদের মুখে জনকল্যাণের কথা শুনতে শুনতে মানুষ ক্লান্ত হবে, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। মাঝেমধ্যে সংকট নামক অভিশাপ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে, পক্ষান্তরে খাগড়াছড়ির রামগড়ে এক ব্যবসায়ীর ৪টি গুদামে ৫৭ হাজার লিটার সয়াবিন তেলের অবৈধ মজুদ ধরা পড়বে। পরিণামে মাত্র এক লাখ টাকার দণ্ডে ছাড় পাবে, যাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে না। কারণ তাদের আছে খুঁটির জোড়! যে জোড়ের বলে নামমাত্র জরিমানায় এত বড় অপরাধ করার পরও এর চেয়ে বেশি শাস্তি ভোগ করতে হয় না।

মোদ্দাকথা, ঘুণে ধরা পচা সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা না গেলে গুটিকতক শিল্পগোষ্ঠী ও হাতে গুনা স্বল্পসংখ্যক মানুষের বিলাস বৈভব যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের পকেট কেটে শূন্য করে নিজেরা টাকার পাহাড় গড়ে তুলবে। ফলে করোনাকালীন যখন মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে চার কোটি মানুষ দরিদ্র হয়, তখন দেশে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যে কারণে সাধারণ মানুষকে বাঁচতে হলে সমাজব্যবস্থা বদলের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

ahairanju@gmail.com