যারা ভোজ্য তেলের সংকট সৃষ্টি করে ও দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, যাদের কারণে ব্যবসায়ীদের গালি শুনতে হয়েছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন। একই সঙ্গে দামে কারসাজি বন্ধে যত দ্রুত সম্ভব খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ এবং দাম কমাতে তেল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ভোজ্য তেলের আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট।
সভায় উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, ভাইস প্রেসিডেন্ট এমএ মোমেন, আমিন হিলালী, হাবীব উল্যাহ ডন, এমএ রাজ্জাক। ভার্চুয়ালি যুক্ত হন চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে তেলের মজুদ থাকার পরও বিক্রি করেননি। এটা হতে পারে না। গুটি কয়েক ব্যবসায়ীর কারণে সব ব্যবসায়ীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতিকে।
ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আপনারা আমার সঙ্গে মিটিং করে বলেছেন তেলের দাম বাড়াবেন না। বুকে হাত রেখে প্রকৃত কাজটা করেন। পেঁয়াজ, আলুর দাম বাড়াতে পারেন না। সুযোগ পেলেই তেলে দাম বাড়াবেন এটা হতে পারে না। কুষ্টিয়ায় এক দোকানে তেল পাওয়া গেছে যার কোনো ব্যবসাই নেই। দু-একজন অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সারা দেশের ব্যবসায়ীরা গালি খাবে কেন?’
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মাওলার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এখন যেহেতু তেলের সংকট, তাই বেশি মজুদ করার দরকার নেই। বেশি মজুদ করার দায় আপনারা এড়াতে পারবেন না।’
দাম নিয়ন্ত্রণে যত দ্রুত সম্ভব খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করা উচিত মন্তব্য করে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পলিথিনের প্যাকেটে তেল বিক্রি করা হলে তেলের দাম ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব, দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর শিল্পকারখানার তেল ব্যবহার হবে ড্রামে। বর্তমানে তেল আমদানিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এটা প্রত্যাহার করা হলে তেলের দাম আরও কমে যাবে।’
এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘প্রতিদিনই সয়াবিন তেলের দাম কমছে-বাড়ছে। সেখানে ১৫ দিন পরপর তেলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী আমাদের (ব্যবসায়ী সমাজ) মান-ইজ্জত নিয়ে খেলবেন এটা হতে পারে না।’
স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা রোজার শুরুতেই ব্যবসায়ীদের দামের বিষয়ে সতর্ক করেছিলাম। দেশবাসীর কাছে ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন গুটিকয়েক ব্যবসায়ী।’
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘যারা তেল মজুদ করেছে, তারা অনৈতিক কাজ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মাওলা বলেন, ‘মাদক কারবারিদের মতো ভোজ্য তেল মজুদদারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে কেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা মজুদ না করলে বিক্রি করবেন কীভাবে।’
এস আলম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঈদের আগে আমরা প্রতিদিন ব্যবসায়ীদের ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন তেল সরবরাহ করেছি। কিন্তু তেল কোথায় গেল। এখনো আমাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আশা করছি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
নিউমার্কেট ডি-ব্লক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের তেল দিতে রিফাইনারিগুলো শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। তেলের সঙ্গে গেটিস হিসেবে চা-পাতা ও পোলাও চাল নিতে বাধ্য করেছে। তারপরও আমরা চাহিদামতো তেল পাইনি। সরবরাহকারীরা আমাদের হাতে তেল পৌঁছে দেয়নি।’
টি কে গ্রুপের পরিচালক সফিউল আতহার তসলিম বলেন, ‘তেলের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার ২০ শতাংশ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) আমদানি করা উচিত।’
সিটি গ্রুপের উপদেষ্টা অমিতাভ চক্রবর্তী বলেন, ‘কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সরবরাহ করার মতো তেল আমাদের কাছে রয়েছে।’
গত ৫ মে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩৮ টাকা বাড়ানো হয়। কিন্তু সয়াবিনের সংকট রয়ে যায়। কেন সংকট হলো, তা জানতে ৯ মে সচিবালয়ে মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তখন মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা কথা রাখেননি।