যৌথ ব্যবস্থাপনায় চিনিকল চালাতে চায় সরকার

ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে আসা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো যৌথ ব্যবস্থাপনায় চালাতে চায় সরকার। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে চিনিকলগুলো চালানোর জন্য নীতিগত এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।

থাইল্যান্ডের সুগার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গঠিত কোম্পানির সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। বিনিয়োগের একটি বড় অংশ  দেবে ওই কোম্পানি। এর জন্য ঋণ দেবে জাপান ও থাইল্যান্ড।

প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য এখন ব্যাংক গ্যারান্টিসহ অন্যান্য আইনগত দিক পর্যালোচনা করতে ধারাবাহিক বৈঠক করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে গত ১৯ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চিনিকলের বেসরকারিকরণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ এপ্রিল সমন্বয় সভা করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন) এস এম আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কাছে পাওনা ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। অথবা অর্থ বিভাগ এ ঋণের গ্যারান্টির মেয়াদ ঋণ পরিশোধের সময় পর্যন্ত বাড়াবে। ঋণের এ গ্যারান্টির মেয়াদ ২০১৮ সালে শেষ হয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) কাছে পাওনা ঋণের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে পারবে মর্মে ১৪ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত মতামত শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। বাংলাদেশ সরকারের সভরেন গ্যারান্টির (সার্বভৌম জামানত) বদলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ব্যাংক গ্যারান্টির বিনিময়ে জাপানের জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) ও থাইল্যান্ডের এক্সিম ব্যংক প্রয়োজনীয় ঋণ দেবে কি-না তা জানার জন্য চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে।

অতিরিক্ত সচিব (রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন) এস এম আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে এখনই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাননি। পরে এ বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ দেখিয়েছেন। 

বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, চিনিকলগুলো চালাতে হলে ৬৪৫ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। যার ৭০ শতাংশ ঋণ ও ৩০ শতাংশ ইক্যুইটির মাধ্যমে বিনিয়োগ হবে। জাপানের জেবিআইসি এবং থাইল্যান্ডের এক্সিম ব্যাংক ৭০ শতাংশ ঋণ দেবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সভরেন গ্যারান্টি দেবে না। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক থেকে গ্যারান্টি পাওয়া যাবে কি না তা সভাপতি বৈঠকে জানতে চান।

সভায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রতিনিধি গ্যারান্টির ধরনের বিষয়ে জানতে চান। এ-সময় সুগার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে বিধায় বাংলাদেশ সরকারকে গ্যারান্টি দিতে হবে। তবে সুগার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি এ প্রকল্পে যে বিনিয়োগ করবে তার পুরোটাই বাংলাদেশ সরকার কোলাটেরাল (সমান্তরাল জামানত) হিসেবে দেবে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ ঋণ সম্পূর্ণ কোলাটেরাল হিসেবে দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বৈঠকে জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংক পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারে। কিন্তু সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে শতভাগের বেশি এবং জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংক ২০ শতাংশের বেশি ঋণ এর মধ্যেই দিয়েছে। এ ঋণের বিপরীতে অর্থ বিভাগের গ্যারান্টির মেয়াদ ২০১৮ সালেই শেষ হয়েছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কাছে পাওনা ৭ হাজার ৯৪৬ টাকা পরিশোধ করতে হবে অথবা অর্থ বিভাগকে ওই গ্যারান্টির মেয়াদ পরিশোধের সময় পর্যন্ত বাড়াতে হবে।

বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিনিধি জানান যে জি টু জি চুক্তি (সরকারের সঙ্গে সরকারের চুক্তি) হচ্ছে না বিধায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সভরেন গ্যারান্টি দেওয়ার সুযোগ নেই। এই প্রকল্পে যদি লোকসান হয় তাহলে ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে তা তিনি জানতে চান। এর জবাবে বৈঠকের সভাপতি জানান, পুরো বিনিয়োগটি ব্যাংকের কাছে কোলাটেরাল হিসেবে থাকবে। এ কারণে লোকসান হলে ব্যাংক তা হস্তগত করতে পারবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যেহেতু ব্যাংক এভাবে ঋণ দিয়ে আসছে তাই সমস্যা হবে বলে তিনি মনে করেন না। তা ছাড়া এক্ষেত্রে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার রয়েছে যা একটি অতিরিক্ত সুবিধা বলে তিনি মনে করেন।

বৈঠকে জনতা ব্যাংকের প্রতিনিধি জানান যে, বিনিয়োগের ৭০ শতাংশ ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে বিধায় প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। এই অবস্থায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা) জানান, যন্ত্রপাতি আসার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক ব্যাংকগুলো ব্যাংক গ্যারান্টি দেবে। যন্ত্রপাতি একসঙ্গে না আসার কারণে ধাপে ধাপে ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার সুযোগ আছে কি-না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে বলে জানান তিনি। 

চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে চিনিকল আছে ১৫টি। এর মধ্যে কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর (রংপুর), রংপুর ও সেতাবগঞ্জ (দিনাজপুর) চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, আপাতত তিন চিনিকলে বিদেশিদের অংশীদারত্ব চায় সরকার। সেতাবগঞ্জ, রাজশাহী ও মোবারকগঞ্জ চিনিকল এ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হবে। পরে ধারাবাহিকভাবে দেশের অন্য চিনি কলগুলোও এ প্রক্রিয়ায় চালানো হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, আপাতত তিনটি চিনিকল বিদেশি  কোম্পানির সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।  তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, লোকসানে থাকা চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাভজনক করার পরিকল্পনা কয়েক বছর আগে নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন   কোম্পানির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। এখন থাইল্যান্ডের সুগার ইন্টারন্যাশনাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)ভিত্তিক সারাকার ইন্টারন্যাশনাল, আওয়াদ আল আমরি ও বেদোয়ার যৌথ উদ্যোগে গঠিত কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে সেতাবগঞ্জ, রাজশাহী ও মোবারকগঞ্জ চিনিকল পরিচালনার আলোচনা চলছে।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিনিকলগুলোর বিষয়ে কোনো পক্ষই জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে না। ফলে যৌথ অংশীদারত্বে পরিচালনার উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

অনেক পুরনো হওয়ায় কয়েকটি চিনিকলের উৎপাদন ক্ষমতা একেবারে কমে গেছে। ফলে গত পাঁচ বছরে এ খাতে প্রায় চার হাজার ৩৫১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৯১৩ কোটি টাকা। লোকসান কাটিয়ে উঠতে ও চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়নের জন্য ২০১৯ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।