চার দশক ধরে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানির পর দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে পোশাক শিল্পে সেরা কারখানাগুলোর বড় অংশই বাংলাদেশের। তবে এত দীর্ঘ সময় ও সেরা কারখানা থাকার পরও তৈরি পোশাক পণ্যে বৈচিত্র্য আনা যায়নি, বরং উল্টোপথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। সারা বিশ^ যেখানে সিনথেটিক বা ম্যান মেইড ফাইবারে তৈরি পোশাকে ঝোঁক বাড়িয়েছে, সেখানে এখনো কটনে তৈরি পোশাক শিল্পেই সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এবং তা কটনে তৈরি পোশাককে কেন্দ্র করেই বাড়ছে। দেশের রপ্তানিকৃত পোশাকের ৭৪ শতাংশই কটনের, যা দশ বছর আগে ছিল ৬৯ শতাংশ। অথচ বিশ্ববাজারের টেক্সটাইল চাহিদার ৭৫ শতাংশই নন-কটনের, যার মধ্যে আবার ৬৪ শতাংশই সিনথেটিক বা ম্যান মেইড ফাইবারের। পোশাক শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন, সিনথেটিক বা ম্যান মেইড ফাইবার পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ‘পেট্রোকেমিক্যাল চিপস’ না থাকায় এ শিল্পে এগোতে পারছে না বাংলাদেশ। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নন-কটন পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ প্রণোদনা চেয়েছেন পোশাক মালিকরা।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান জানান, বিশে^ নন-কটনের চাহিদা বাড়লেও গত দশ বছরে কটন নির্ভরতা উল্টো বেড়েছে। ২০১৭ সালে সারা বিশে^ ম্যান মেইড ফাইবারের বাণিজ্য ছিল ১৫০ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে কাছের প্রতিযোগী দেশ হিসেবে বিবেচনায় থাকা ভিয়েতনামের সেখানে শেয়ার ছিল ১০ শতাংশ, আর বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ। প্রতিযোগী দেশগুলোতে এই শিল্পের কাঁচামাল ‘পেট্রোকেমিক্যাল চিপস’ থাকায় এবং তাদের স্কেল ইকোনমির কারণে তারা সক্ষমতায় এগিয়েই থাকছে।
গতকাল রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বছর প্রথমবারের মতো সপ্তাহব্যাপী ৩৭তম ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন কনভেনশনের আয়োজন নিয়ে এসব কথা বলেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশন (আইএএফ), বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর যৌথ উদ্যোগে ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে পোশাক রপ্তানির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ফারুক হাসান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আইএএফের সেক্রেটারি ম্যাথিজস ক্রিয়েটি ও বিকেএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ফজলে শামীম এহসান।
অবশ্য করোনা মহামারীর ধকল ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের পরও দেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। আয়োজকরা জানান, চলতি অর্থবছর শেষে এ খাতের রপ্তানি ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ২০২২ সাল শেষে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শেয়ার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রম করবে। ২০২৫ সাল নাগাদ তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এজন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক কর ও মূসক হার একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য নির্ধারিত চান ব্যবসায়ীরা। কর ও রাজস্ব সংক্রান্ত নীতিগুলো অন্তত ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখা জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আয়োজকরা জানান, তিন বছর আগে দেশে ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন কনভেনশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে দেশের পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা এই আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে করোনা থাকায় সেই বছরও এই আয়োজন করা যায়নি। এছাড়া যেহেতু আন্তর্জাতিক সংগঠনের আয়োজনে এই কনভেনশন তাই এই আয়োজন কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, গত দুই বছরে দেশে ও দেশের বাইরে আমরা কোনো মেলা বা এক্সিবিশন করতে পারিনি। আমাদের যে সক্ষমতা এই আয়োজনের মাধ্যমে তা তুলে ধরব। সভা সেমিনার, ফটোগ্রাফের মাধ্যমে দেশের ব্র্যান্ডিং করা হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে আইএএফের সেক্রেটারি ম্যাথিজস ক্রিয়েটি বলেন, ৩৭তম ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন কনভেনশনে ১০০ থেকে ১৫০টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে।
ফারুক হাসান আরও বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে একদিকে যেমন জ্বালানি তেলসহ খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে। এর পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহভাবে বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষয়টি আমাদের উদ্যোক্তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। এই পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানিতে বর্তমানে যেই প্রবৃদ্ধিটি দেখা যাচ্ছে, সেটির দিকে না তাকিয়ে থেকে বরং কীভাবে আমরা প্রতিযোগী সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারি, কীভাবে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারি, সেটিই আমাদের কৌশল হওয়া উচিত।
বিশ্ববাজারে এখনো ব্র্যান্ডিং জটিলতায় ভুগছে বাংলাদেশ। পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ না থাকলেও দীর্ঘদিন রপ্তানিতে নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশে এবারই প্রথম আইএএফের আয়োজনে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩৭তম ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন কনভেনশন। বিশেষত ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর কীভাবে এ খাত নন-কমপ্লায়েন্ট থেকে বিশ্বের অন্যতম কমপ্লায়েন্ট ও গ্রিন কারখানার হাব হয়ে উঠছে, তা তুলে ধরা হবে কনভেনশনে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ওইসব কারখানা ঘুরিয়ে দেখানো হবে।