চট্টগ্রামের উইকেটে ঘাস কেন? সকালে সবুজ পিচ দেখে বিস্ময় লাগার কথা। স্বস্তির কথা হলো এই ঘাসে ক্ষতি নেই। উইকেট যেন চতুর্থ-পঞ্চম দিনে না ফাটে তাই এরকম ঘাস রাখা। তাই টস জিতে শুরুতে ব্যাটিং নিতে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দিমুথ করুনারতেœর কোনো দ্বিধাই হয়নি। দিন শেষে ৪ উইকেটে ২৫৮ রান বেশ স্বস্তির। তা এনে দিয়েছেন অপরাজিত সেঞ্চুরিয়ান অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। বাংলাদেশের বিপক্ষে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিতে ১১৪ রান করে উইকেটে আছেন। তার ব্যাটেই একটু এগিয়েও আছে অতিথিরা। বাংলাদেশকে লড়াইয়ে রেখেছেন জোড়া উইকেট নেওয়া নাঈম হাসান। তবে ম্যাচে এগিয়ে যেতে হলে আজ সকালেই দুই উইকেট নিতে হবে বলছিলেন বোলিং কোচ রঙ্গনা হেরাথ। কোনো ভাবেই শ্রীলঙ্কাকে আজ আর ১২০-১৩০ রানের বেশি এগোতে দেওয়া যাবে না। মানে ৪০০ রানের নিচে থামাতে হবে শ্রীলঙ্কাকে। কিন্তু এই উইকেটে সেই লক্ষ্যে সফল হওয়া কি সম্ভব।
উইকেট যত ব্যাটিং সহায়ক-ই হোক, বাংলাদেশের পরিকল্পনা ঠিক পথেই ছিল। সাকিবসহ ৫ বোলার নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ বোলিং লাইন নিয়ে নামে স্বাগতিকরা। স্পিন বোলিং কোচ হেরাথও স্বীকার করলেন এই উইকেট ও গরম কন্ডিশনে ৫ বোলার অবশ্যই প্রয়োজন, ‘যে পরিবেশ, এখানে ৫ বোলারের কম নিয়ে খেললে সবকিছু কঠিন হয়ে যেত। ৫ জন থাকায় বেশি অপশন পেয়েছি এবং বোলারদের ক্লান্তিটাও কম হয়েছে।’ দিনের শুরুর সেশনে মাত্র ৭৩ রান দিয়েছেন বোলাররা। নাঈম হাসান দলে ফিরে দারুণ বল করেছেন। শরিফুল-তাইজুলরাও ঠিক রেখেছিলেন লাইন। ফিটনেসের দিকে পিছিয়ে থাকা সাকিব এসেও রান চেকে রেখেছেন। লঙ্কান ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিসকে তাই মানতেই হলো বাংলাদেশ বোলারদের বিপক্ষে রান সহজে পাচ্ছিলেন না, ‘এই উইকেটে সহজ মনে হলেও ওদের বোলাররা রান তোলা কঠিন করেছিল। তার ওপর এই গরম। বিশেষ করে তাইজুল তেমন সুযোগই দেয়নি। আমরা যতক্ষণ ছিলাম সংগ্রাম করেই রান করেছি।’ লঙ্কানদের সংগ্রাম অবশ্য পরের দুই সেশনে সহজ হয়ে যায়। তাদের চাপটা হালকা করে দেন খালেদ আহমেদ ও নাঈম হাসান। দুজনই ওভারপ্রতি ৪ এর ওপর রান দিয়েছেন। বাকিরা তিন-এর নিচে। তাই দিন শেষে শুরুর চাপটা আর ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে হেরাথ আশা হারাচ্ছেন না। জানালেন এখনো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব, ‘ম্যাথিউসের সঙ্গে আগে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সে রানের জন্য লড়াই করে। রান করতে চায়। কাল (আজ) আমাদের ওকেসহ শুরুতেই দুটি উইকেট নিতে হবে। আর ১২০-৩০ এর মধ্যে যদি রাখতে পারি তাহলে অবশ্যই আমরা ম্যাচে থাকব।’
দিনের প্রথম সেশনটা বাংলাদেশেরই বলা চলে। এক সেশনে ৩০ ওভার খেলার কথা থাকলেও হয়েছে ২৪ ওভার। এতে দোষের কিছু নেই অবশ্য। তবে এই ওভারে ১০০ বা তার বেশি রান হলে সেশনটি ব্যাটিং দলের ধরা হয়। বাংলাদেশ বোলাররা তা হতে দেননি। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কার রান আটকে রেখেছেন। তাই সেশনে ২ উইকেটে ৭৩ রান তুলতে পারে সফরকারীরা। দুই উইকেটই এসেছে নাঈম হাসানের দুর্দান্ত দুটি বলে। ২০২১ এরপর দলে ফিরে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন স্পিনার। করুনারতেœ তার সোজাসুজি আসা বলে ব্যাকফুটে কাট করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৯ রানে। শুরুর ধাক্কা সামলে দাঁড়িয়ে যায় লঙ্কার জুটি। উইকেটে আর্দ্রতা শুকাতে ওশাদা ফার্নান্দো ও কুশাল মেন্ডিসের জন্য ব্যাট করা যেন আরও সহজ হয়। জুটি বেশি বড় হওয়ার আগে ৪৩ রানে থামান নাঈম ওশাদাকে ড্রাইভের ফাঁদে ফেলে কটবিহাইন্ড করে (৭৬ বলে ৩৬)।
দুই উইকেটের সাফল্য এলেও সেশনটি হতাশার ছিল রিভিউ আবেদনে। বাংলাদেশ আবারও টেস্টে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটায় ব্যর্থ। এক সেশনে দুই রিভিউ হারানো শরিফুলের ওভারেই। প্রথমটিতে বল পড়েছিল লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে, আর পরেরটিতে বল ব্যাটসম্যানের প্যাডে লাগে অফস্ট্যাম্পের বাইরে থেকে। দুবারই রিভিউ নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা বোলার শরিফুলের। কিন্তু অনভিজ্ঞতায় দুবারই এলবিডব্লিউর সঠিক অনুমানটা করতে পারেননি এ পেসার।
দ্বিতীয় সেশনে আর প্রথমটির মতো সফলতা আসেনি। পুরোটাই নিজেদের করে নেয় শ্রীলঙ্কা। শুরুতে বোলাররা রান দিলে ইনিংসের ৩৬তম ওভারে সাকিবকে আক্রমণে টানেন মুমিনুল। জমে যাওয়া মেন্ডিস-ম্যাথিউস জুটির রানের গতি থামে তাতে। তবুও ৩২ ওভারের সেশনে বিনা উইকেটে ৮৫ রান নিয়ে ফেলে শ্রীলঙ্কা। ৯২ রানের জুটিতে দুই ব্যাটারই তুলে নেন ফিফটি। চা বিরতির পরই আসলে সাফল্য। তাইজুলের শর্ট বলে না বুঝে পুল শট করতে গিয়ে ক্যাচ দেন কুশল মেন্ডিস। ১৩১ বলে ৫৪ রানে থামেন ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকা এই ব্যাটার। ২৫ রানের ব্যবধানে আরও একটি উইকেট নেয় বাংলাদেশ। এবার সাকিব ফেরান ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে মাত্র ৬ রানে। ব্যাট-প্যাড হয়ে শূন্যে ওঠা ক্যাচটি সিøপ থেকে এগিয়ে ডাইভ দিয়ে তালুবন্দি করেন মাহমুদুল হাসান জয়। এবার রিভিউ নিয়ে সফল হয় বাংলাদেশ। ওদিকে একপ্রান্তে সাবলীল খেলতে থাকা ম্যাথিউস তুলে নেন সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ও ক্যারিয়ারে ১২তম। অথচ ৩৮ ও ৫৯ রানের দিকে দুবার জীবন পান অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। একবার রিভিউ নিয়ে টিকে যান আরেকবার সিøপে ফিল্ডার ক্যাচ ধরতে না পারায়। দিনের শেষ পর্যন্ত ১১৪ রানে অপরাজিত থাকেন ম্যাথিউস। শেষদিকে ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে সাকিব ফেরালেও লঙ্কান সেরা ব্যাটারকে ফেরানো যায়নি। পুরো সেশনে ২ উইকেট নিয়ে ১০০ রান দিয়েছে বাংলাদেশ।
উইকেট বোলারদের জন্য খুব কঠিন। প্রচন্ড গরমে এই উইকেটে দিনে চার উইকেট নেওয়া হেরাথের কাছে সফলতা। বোলিং কোচের চোখে এই সফলতার পরও চট্টগ্রাম টেস্টে এগিয়ে থাকার ঘোষণা দিতে পারছে না মুমিনুল হকের দল। অবশ্য ম্যাচের এখনো অনেক বাকি। আজ লঙ্কানদের দ্রুত ফেরালে টেস্টে এগিয়ে যাওয়ার পথও পেয়ে যাবে বাংলাদেশ।