দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জাতীয় নির্বাচন ও নারীর অংশগ্রহণ

গণমাধ্যম সূত্রে দেখা যাচ্ছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে এরই মধ্যে বেশ ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। যদিও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নাভিশ্বাস ওঠা পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ জনগণ এ নিয়ে খুব আগ্রহ বোধ করছে বলে মনে হয় না। চলমান পরিস্থিতিতে বরং ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়া দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বর্তমান রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা কতটা ভাবিত, সংগত কারণে জনগণের সিংহভাগের মনোযোগ এখন সেদিকে। আমাদের অতি ধার্মিকতা ও ধর্মান্ধতার দেশে অধিক মুনাফার লোভে পবিত্র রমজানের মধ্যেও অসৎ ব্যবসায়ীরা কীভাবে লাখ লাখ লিটার সয়াবিন তেল গুদামজাত করে তেল সংকটকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিদিনের অভিযানের মাধ্যমে জনগণ এখন তা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছে আর প্রমাদ গুনছে। আমরা এতই ধার্মিক যে সবকিছুতেই ধর্মকে মিশিয়ে ফেলেছি ও ফেলি। ব্যবসা ক্ষেত্রও এর বাইরে নয়, যেজন্য আমাদের বাজারে ‘হালাল’ সিল দেওয়া পণ্য পাওয়া যায়। অথচ ঈদকে সামনে রেখে সংযমের ব্রত পালনরত অবস্থাতেও আমরা মজুদদারি ত্যাগ করতে পারি না, যেখানে পৃথিবীর অনেক দেশেই ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিয়ে থাকে।

সবাই জানে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কমবেশি সারা বিশে্বই পড়েছে। সয়াবিন ও জ¦ালানি তেলসহ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও এখন শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, যা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়ছে। প্রভাবটা পড়ছে পদ্ধতিগতভাবে। খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি আর অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন বিশ্বের অন্তত ১৭০ কোটি মানুষ, যাদের এক-তৃতীয়াংশই এখন দারিদ্র্য অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।’ কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে, যেসব পণ্যের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনোভাবেই কোনো সম্পর্ক নেই, রাতারাতি সেসব পণ্যেরও দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যই দরিদ্র মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু পরস্পরকে দোষারোপ করা ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলোর এ নিয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা সাধারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না সরকার বা ব্যবসায়ীদের সংগঠনসহ অন্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও। বরং ভোক্তাদের ভোগে সংযমী হতে বলা হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজারব্যবস্থাকে মনিটরিং করা না গেলে দিন দিন সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণ ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে যাবে।

যাই হোক, আমার এই লেখা শুরু করেছিলাম দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শুরু হওয়া তৎপরতার আভাস দিয়ে। যেহেতু নির্বাচন নিয়ে এখনই বিভিন্ন কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, আমিও এই সুযোগটি নিতে চাই। নারী, দরিদ্র ও সংখ্যাল্প জনগণের পক্ষে কিছু প্রশ্ন জনপরিসরে তুলে রাখতে চাই, যাতে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়গুলো ভাবার অবকাশ পায়। নির্বাচন সামনে রেখে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সরাসরি ও ইঙ্গিতে এখনই বিভিন্ন হুমকি-ধমকি লক্ষ করা যাচ্ছে। এসবের মধ্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যাতে নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কা করা যায়। সহিংসতা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বড় অন্তরায়, যে রকম নির্বাচনী পরিবেশ জনগণ প্রত্যাশা করে না। পাশাপাশি যেসব কথা শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে একটি হলো নির্বাচনের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা। কোনো সন্দেহ নেই যে, যেকোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে কথিত এই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যই চাওয়া হচ্ছে, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের, বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর কোনো জায়গা নেই। এই অবস্থাদৃষ্টে আমার জানতে ইচ্ছে করে যে, নারীরা আগামী নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাবে কি না এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো কী ভাবছে? নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল কি ৫০ শতাংশ না হোক নিদেনপক্ষে ৩৩ শতাংশ সাধারণ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা ভাবছে? মনোনীত নারী প্রার্থীদের কি এ রকম নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ভাবা হবে যে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কালো টাকা ও পেশিশক্তির মোকাবিলা তাদের করতে হবে না বা কোনো আসনেই টাকা দিয়ে ভোট কেনা হবে না বা কেউ শক্তি প্রদর্শন করে নির্বাচনে জিততে চাইবে না? কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো কি চিহ্নিত নারী নির্যাতনকারী ও নারীবিরোধী ব্যক্তিদের জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত থাকবে? যদি তা না করা হয় তাহলে নারীর জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে না। আমরা চাই, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো সব নাগরিকের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুক। পাশাপাশি ঠিক করুক নির্বাচিত হলে ও সরকার গঠন করলে কীভাবে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কীভাবে নারী-পুরুষ বৈষম্য ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। অনেক ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে নির্বাচন মানেই একটা মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। এ ধরনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটুক সেটা কেউই চায় না। সাধারণ মানুষের চাওয়াও সাধারণ। তারা চায়, প্রতিটি নির্বাচনই যেন আতঙ্কের জন্ম না দিয়ে উৎসবে পরিণত হয়। তাদের চাওয়া হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল নির্বাচিত হবে সে দল সরকার গঠন করবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষ দেখতে পায় ভোট দেওয়া বা না দেওয়ার কারণে অনেক ভোটারকে শারীরিক-মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি নির্বাচনের কারণে কাউকে কাউকে সপরিবারে দেশও ছেড়ে যেতে হয়। আমাদের জনগণের এ রকম অভিজ্ঞতাও আছে যে, তাদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ক্রমেই অনেক দূরের বাসিন্দা হয়ে যান, ভোটাররা পরবর্তী পাঁচ বছরে যাদের ছায়াও দেখতে পায় না। কিংবা দূরে থেকেও নির্বাচিতরা নিজেদের স্বার্থে যতটা ব্যস্ত থাকেন, জনকল্যাণে ততটা ভূমিকা রাখেন না। সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীকে নির্বাচনে আগ্রহী করে তুলতে চাইলে তাদের আশ^স্ত করতে হবে যে, এ ধরনের অভিজ্ঞতার মোকাবিলা ভোটারদের আর করতে হবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও কথাবার্তায় তার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে না। 

রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা দরকার যে, নারীরা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশ এবং তারাও প্রত্যেকে পুরুষ ভোটারের মতো একটি করে ভোটের মালিক। তারা নিশ্চয়ই এমন কোনো দল বা প্রার্থীকে ভোট দেবে না যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এবং যারা নারী ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করে না। যারা নারী নির্যাতনকারী, ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা নারীর প্রতি ঘৃণ্য উক্তি করে ও তাদের গৃহবন্দি করে রাখতে চায়, যারা ধর্মের নামে অধর্ম করে ও দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের দুর্দশা বাড়ায়, যারা উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারে বিশ্বাস করে না, নারীরা যাতে এদের বাদ দিয়ে নির্বিঘে্ন ও নির্ভয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে নির্বাচনে সেই পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরি।

এই অঙ্গীকারগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে, যাতে এ ধরনের ব্যক্তিদের তারা প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না দেয়। সব নাগরিকের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য এ বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এই প্রশ্নে নতুনভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশনের কাছেও নারীসমাজের প্রত্যাশা অনেক। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল যাতে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে তা অতি অবশ্যই দেখতে হবে এবং দলগুলো যাতে ৩৩ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেয় সে ব্যাপারে তাদের উদ্বুদ্ধও করতে হবে। তা ছাড়া, এটা নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো অবস্থাতেই নির্বাচনে সন্ত্রাস-সহিংসতা ও কালো টাকা প্রশ্রয় না পায়।

লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী। নির্বাহী পরিচালক, নারী প্রগতি সংঘ