ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে ডানা মেলা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার (এনডব্লিউও) বা নয়া বিশ্বব্যবস্থা। ১৯৯০-এর দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সাড়া ফেলে। সবশেষ পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের পর নয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে জল্পনাকল্পনা নতুন করে ডানা মেলেছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

কমপক্ষে এক শতাব্দী আগে ষড়যন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে নয়া বিশ্বব্যবস্থার উত্থান। সময়ের পরিক্রমায় প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সময়ে এবং এরপর ১৯৯০-এর দশকে বিশিষ্ট রাজনীতিকদের এই দর্শনের উল্লেখ করতে দেখা যায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞ ও পন্ডিতরা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের এই পরিভাষাটিকেই আবার ব্যবহার করছেন। রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইলুমিনাতি, ক্যাবাল, বিশ্বায়ন, বহু সংস্কৃতিবাদ, শয়তানি মিশন, ডেস্টোপিয়া, ডিপ স্টেট, শেষ সময়, কিউএনের মতো রাজনৈতিক দর্শনের ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে। ইন্টারনেট ষড়যন্ত্রতত্ত্বের একটি প্রজনন ক্ষেত্র, যা আজকাল রাজনীতি এমনকি রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনকে বিশ্ব দরবারে অভিজাত গোষ্ঠীর এক ঘৃণ্য পরিকল্পনার ঘুঁটি হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এ কাহিনীর প্রসারেই নয়া বিশ্বব্যবস্থা ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি নতুন প্রাণ পেয়েছে।

শুরুর কথা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান একটি জাতীয় প্রতীক হলো গ্রেট সিল বা সিলমোহর। ১৭৮২ সাল থেকে এ সিলমোহরের পেছনের অংশে লাতিন শব্দগুচ্ছ ‘নোভাস অরদো সেকলোরাম’ সংযুক্ত এবং ইউএস ওয়ান ডলার বিলের পেছনের অংশে ‘যুগের নতুন আদেশ’ হিসেবে এর অনূদিত অংশ ১৯৩৫ সাল থেকে প্রদর্শিত হয়ে আসছে। এর মধ্য দিয়েই স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে একটি যুগের শুরুর আভাস দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর শুরুর ইঙ্গিতেই নয়া বিশ্বব্যবস্থার উত্থান বলে দাবি ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের।

সহস্রাব্দ ধরে আমেরিকায় বহুত্ববাদী ধারণা শক্তিশালী। তা সত্ত্বেও সমসাময়িককালে ব্যাপক স্বীকৃতির মাধ্যমে ধর্মীয়, ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল গোষ্ঠী একটি ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে মন দিয়েছে, যা সাধারণত নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার (এনডব্লিউও) বা নয়া বিশ্বব্যবস্থা শব্দগুচ্ছ দ্বারা বোঝানো হয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এ অধ্যায়টি ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে এসেছে। কারণ এটি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা থেকে আলাদাভাবে বিকশিত হয়ে পরবর্তীকালে ভিন্ন রূপ পেয়েছে। এ দুটি স্বতন্ত্র ধারার সমন্বয়ে  একটি অশুভ শক্তি হিসেবে নয়া বিশ্বব্যবস্থা ধারণাটির উদ্ভব। সহস্রাব্দ ধরে চলে আসা এ দুটি ধারা হলো খ্রিস্টধর্ম ও রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি। শেষ সময় সম্পর্কে এ জল্পনাগুলো এমন একটি ধারণা দিয়েছিল,  যেখানে  বলা হয়েছিল খ্রিস্টবিরোধী এক অনিষ্টকারী ব্যক্তি বিশ্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিতে অতীত ও বর্তমান উভয় ঘটনাপ্রবাহকে ‘ইলুমিনাতি’ নামে পরিচিত একটি শক্তিশালী কিন্তু গোপন গোষ্ঠীর প্রচেষ্টার ফল হিসেবে সামনে আসবে।

ইলুমিনাতি

বিশ্বের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাতদের নিয়ে গঠিত এক রহস্যময় আন্তর্জাতিক সংস্থা ইলুমিনাতি। পর্দার আড়ালে থেকে পুরো বিশ্বের কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করে তারা। নয়া বিশ্বব্যবস্থা-সংক্রান্ত সবচেয়ে বিখ্যাত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এটি। কয়েকশ বছর ধরে ইলুমিনাতিদের কিংবদন্তি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রহস্যময় সংস্থা বিশে^র অনেক ক্ষেত্র পরিচালনা করে বলে ধারণা করা হয়। যেমন রাজনীতি, সামরিক কর্মকা-, অর্থনীতি এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে ইলুমিনাতিরা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় পুরো বিশ্বকে পরিচালিত করে। সত্যিকার অর্থেই ইলুমিনাতিরা আছে বলে এখন অনেকেই বিশ্বাস করেন। ১৯৬৯ সালে চাঁদে অবতরণ মিশন, কেনেডি হত্যাকা- এবং নাইন-ইলেভেন নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে ঘটা এ ঘটনাগুলোকে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এসব ব্যাখ্যার মাধ্যমে কিছু প্রমাণ করা কঠিন।

নয়া বিশ্বব্যবস্থা

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘নয়া বিশ্বব্যবস্থা’ শব্দগুচ্ছটির বোধগম্য অর্থ আছে। অনেক দিন ধরে যেকোনো বৈশি^ক দ্বন্দ্ব বা সামাজিক পরিবর্তনের সময় রাজনীতিবিদরা এ পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। মার্চের মাঝামাঝি ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের এক এমপির করা অসতর্ক মন্তব্যকে ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা লুফে নিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনীয় এমপি কিরা রুডি বলেন, ‘ইউক্রেনের জন্যই আমরা শুধু লড়াই করছি তা নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য নয়া বিশ্বব্যবস্থা আনতেই আমাদের এ লড়াই।’

এর কদিন না যেতেই ব্যবসায়িক এক বৈঠকে নয়া বিশ্বব্যবস্থার কথা উত্থাপন করেন বাইডেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা প্রসঙ্গে এ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ‘কিছু বাস্তবসম্মত পরিবর্তন ঘটানোর সুযোগ করে দিয়েছে’। বিশ্ব এখন একটি ‘বিবর্তন বিন্দুতে’ অবস্থান করছে, যা প্রতি তিন থেকে চার প্রজন্মের মধ্যে ঘটে। বাইডেন আরও বলেন, ‘এখন বিষয়গুলো বদলে যাচ্ছে। একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবায়িত হতে চলেছে এবং আমাদেরই এর নেতৃত্ব দিতে হবে।’

অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগের সেন্টার অন এক্সট্রিমিজমের জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো মার্ক পিটক্যাভেজ বলেছেন, ‘অভিজাতরা তাদের নিজেদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জাতি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন।’

তার মতে, কমপক্ষে এক শতাব্দী আগে নয়া এ বিশ্বব্যবস্থার ধারণাটি সামনে আসে। সাধারণত বৈশি্বক কোনো বড় ধরনের পরিস্থিতিকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে এ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহৃত হয়। যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তবে প্রতিবারই কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি এ শব্দগুচ্ছটির উল্লেখ করে থাকেন বলে জানান মার্ক। তার এ মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে ডানপন্থি উগ্রবাদীদের মত হলো, এমন শব্দগুচ্ছের প্রবক্তারা কোনো শান্তিপ্রিয় জাতি চায় না। বরং তারা ‘একটি সমাজতান্ত্রিক এক-বিশ্ব সরকার’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা জাতীয় সীমানা, স্বাধীনতা এবং মুক্তিকে নির্মূল করবে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তীকালের একটি উদাহরণ টেনে আনেন পিটক্যাভেজ। কয়েক দশক আগে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেন। ১৯৯১-এর মার্চে উপসাগরীয় যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসে ভাষণ দেন তিনি। সে সময় সরাসরি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার কথা বলেন। বুশ চার্চিলের কথা উদ্ধৃত করে বলেন, নয়া বিশ্বব্যবস্থায় ‘ন্যায়ের নীতি থাকার কথা বলা হয়েছে। সেখানে শক্তিশালী গোষ্ঠীর দ্বারা শোষিত দুর্বল গোষ্ঠীকে রক্ষার ন্যায্য ব্যবস্থার কথা আছে।’

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের ইতিহাসের অধ্যাপক ক্যাথেরিন ওলমস্টেডের মতে, বুশ ও বাইডেন উভয়েই এ পরিভাষাটি তার ঐতিহাসিক অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগ্রাসন বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার প্রয়োজন আছে তা  বোঝাতেই বাইডেন ও বুশ মূলত একইভাবে পরিভাষাটির ব্যবহার করেছেন।’

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

কেউ কেউ মনে করেন, নয়া বিশ্বব্যবস্থা হলো একটি রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শ, যা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ষড়যন্ত্রের এ মতাদর্শের সংক্ষিপ্ত রূপ এনডব্লিউও। এর শিকড় আমেরিকান ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সংস্কৃতির গভীরে। নয়া বিশ্বব্যবস্থা কথাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরও ব্যবহৃত হয়। সে সময় আদর্শবাদী নেতারা ভবিষ্যতের সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে ১৯২০ সালে গঠিত হয় লিগ অব নেশনস এবং পরে জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটো সৃষ্টি হয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞ ও পন্ডিতরা এ পরিভাষাটির উল্লেখ করেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনে পুতিনের আক্রমণ একটি ‘নয়া বিশ্বব্যবস্থা’র বিপজ্জনক সূচনার সংকেত দিতে পারে। মার্কিন টেলিভিশন ফক্স নিউজ ‘নতুন কর্তৃত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তুতি হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ শিরোনামে একটি মতামত সম্প্রচার করে। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাও ‘ইউক্রেনের ওপর পুতিনের আক্রমণ একটি নয়া বিশ্বব্যবস্থার রূপ দেবে’ এই শিরোনামে একটি কলাম প্রকাশ করে। এ প্রসঙ্গগুলো ডানপন্থি ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের মধ্যে একটি গুঞ্জন তুলেছে। তারা তাদের মিথ্যা দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে যা যা করা দরকার তার ওপর জোর দিচ্ছেন। কয়েক দশক ধরে এ তিনটি শব্দগুচ্ছকে ‘শেষের সময়’ বা পৃথিবীর ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসার জন্য একটি ‘শয়তানি মিশন’-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

শয়তানি মিশন

ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদ অনুসারে, প্রায় ছয় হাজার বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম মানবের আগমন ঘটেছিল বলে ইহুদিদের বিশ্বাস। ইহুদি বর্ষপঞ্জির হিসাবে, ২০২০ সালে পৃথিবীতে মানববসতির বয়স হয়েছে ৫৭৮০ বছর। আর মাত্র ২২০ বছর অতিক্রম করার পর পৃথিবীর বয়স ৬০০০ বছর পূর্ণ হবে। অবশিষ্ট ২২০ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় ইহুদিদের রক্ষাকর্তা বা মসিহের আগমন ঘটবে। ইহুদিরা তাদের মসিহকে ইহুদি জাতির ত্রাণকর্তা মনে করে। ইহুদিরা তাদের মসিহের জন্য একটি রাজকীয় প্রাসাদ (তৃতীয় টেম্পল) নির্মাণ করে রাজা ডেভিডের রূপক সিংহাসন প্রস্তুত করবে। ইহুদিদের বিশ্বাস, তাদের মসিহ ডেভিডের সিংহাসনে আরোহণের পর পুরো পৃথিবী জয় করবে। এর মধ্য দিয়েই ইহুদিরা সমগ্র পৃথিবীর শাসনভারপ্রাপ্ত হবে। তাদের আকাক্সিক্ষত দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বাস্তবায়নের পেছনের রহস্য এটিই। জোর করে জনসংখ্যাশূন্য কর্মসূচি, সরীসৃপসদৃশ ঘৃণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত গোপন শাসক শ্রেণি এবং ‘অভিজাত বিশ্ববাদী’সহ সব ধরনের ডেস্টোপিয়ান ধারণা এ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সঙ্গে জড়িত। ডেস্টোপিয়া হলো একটি কল্পিত রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থা, যেখানে ভয়াবহ যন্ত্রণা ও অবিচার বিদ্যমান। খ্রিস্টানদের বুক অব রেভেলেশনসের ব্যাখ্যায় নয়া বিশ্বব্যবস্থাকে শেষের সময় নিয়ে আসার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি শয়তানি ‘ক্যাবাল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ক্যাবাল

নয়া বিশ্বব্যবস্থা এমন একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, যেখানে গোপনে একটি সর্বগ্রাসী বিশ্ব সরকারের উত্থানের ধারণাকে তুলে ধরা হয়। ধারণা করা হয়, বিশ্ববাদী এজেন্ডা নিয়ে গোপন ক্ষমতাধর এক অভিজাত শ্রেণি কর্তৃত্ববাদী এক-বিশ্ব সরকারের মাধ্যমে বিশ্বকে শাসন করার ষড়যন্ত্র করছে। নয়া এ ব্যবস্থার মতাদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে ক্যাবাল। সম্মুখসারির বেশকিছু সংস্থার মাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এটি পরিচালিত হয়। অনেক প্রভাবশালী ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে ক্যাবালের সদস্য হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনার ক্ষেত্রে বিতর্কিত নীতি চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তারা। চলমান চক্রান্তের অংশ হিসেবে বিশ্বায়ন ও বহু সংস্কৃতিবাদের মতো সমসাময়িক ধারণা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বে আধিপত্য অর্জনের চেষ্টা জারি রাখে ক্যাবাল।

নয়া বিশ্বব্যবস্থা ষড়যন্ত্রের আরও সুনির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তি হয় ১৯৯০-এর দশকে। মনে করা হয়, নয়া বিশ্বব্যবস্থা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জড়িত হয়েছে। পিটক্যাভেজ বলেন, ‘এই বিশ্ববাদী, সমাজতান্ত্রিক, নৃশংস ক্যাবালরা এরই মধ্যে বিশ্বের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।’ উদাহরণ হিসেবে অ্যারিজোনার উগ্র ডানপন্থি সিনেটর ওয়েন্ডি রজার্সের কথা বলা যায়। সম্প্রতি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন তিনি। যেটিকে ‘একটি বড় সুখী ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার ক্লাব’-এর অংশ বলে বিশ্বাস করেন ওয়েন্ডি। টেলিগ্রামে শেয়ার করা তার তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউসি, কোটিপতি সমাজসেবক ও হলোকাস্ট সারভাইভার জর্জ সোরোস, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি, মার্ক জাকারবার্গ, ক্লিনটন ও বুশ পরিবার অন্তর্ভুক্ত।

দ্য ডিপ স্টেট

সিনেটর ওয়েন্ডির তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধে প্রায়ই অন্য একটি ঘৃণ্য ক্যাবাল ‘দ্য ডিপ স্টেট’-এর সদস্য হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এ ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি তুলনামূলক নতুন। ডিপ স্টেট এক ধরনের শাসনব্যবস্থা। ক্ষমতার গোপন ও অননুমোদিত নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত। এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে স্বাধীনভাবে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জনপ্রিয় হলেও এ শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত নেতিবাচক অর্থ বহন করে। পরিভাষাটির সম্ভাব্য ব্যবহারের পরিসীমা ছায়া সরকারের মতোই। ডিপ স্টেট বলতে একটি গোপন সংস্থাকে বোঝায়, যারা জনগণ দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। পিটক্যাভেজ বলেন, ‘সরকারি সংস্থাগুলোর আজীবন সদস্য আমলাদের ধারণা থেকে ডিপ স্টেটের উদ্ভব হয়। যারা স্বেচ্ছাচারীভাবে নতুন প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে চান।’

QAnon(কিউএনন)

এটি একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, যা পরে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। অতি-ডানপন্থি আমেরিকান রাজনীতির ক্ষেত্র থেকে এর উদ্ভব। মূল QAnon তত্ত্ব শয়তানের ক্যাবাল হিসেবে পরিচিত। ইন্টারনেট ষড়যন্ত্রতত্ত্ব পিজ্জাগেটের সঙ্গে এর সরাসরি শিকড় রয়েছে। অন্য অনেক তত্ত্বের উপাদানও এর অন্তর্ভুক্ত। কিছু বিশেষজ্ঞ QAnon-কে একটি ধর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ তত্ত্বের অনুসারীরা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারী। এদের দুই থেকে আড়াই হাজার সমর্থক ২০২১-এর ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল ভবনে দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউক্রেন ও ‘এনডব্লিউও’

বিশ্ব এখন ইউক্রেন, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দিকে তাকিয়ে। কিছু ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা বিশে^র ব্যাপক সমর্থনকে কলঙ্কিত করতেই নয়া বিশ্বব্যবস্থা তত্ত্বের প্রচার করছে। বিপর্যস্ত দেশটি একটি বৈশ্বিক অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদদের ক্যাবালের কেন্দ্রে রয়েছে বলে দাবি তাদের। অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের দিকে সমর্থন জোগাড় করতেও এ গল্প ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলোর মতে, একটি নয়া বিশ্বব্যবস্থার পুতুল ২০১৯ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কৌতুক অভিনেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাকে এভাবেই তৈরি করা হয়েছে যাতে ‘বিশ্ববাদীরা’ তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এদিকে নয়া বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার মহৎ মিশনের জন্য পুতিনকে একজন ভালো ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এ কাহিনী QAnon-এর কিছু পক্ষকে ছাপিয়ে গেছে। তাদের দাবি, পুতিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত জৈব গবেষণাগারগুলো নির্মূল করার জন্যই ইউক্রেন আক্রমণ করছেন। মার্চ মাসে ভাইস নিউজ তাদের প্রতিবেদনে এমন দাবি করে। এ দাবিটি প্রথম রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ এমন দাবিও করেছেন, ইউক্রেনের সংঘাত একটি মিথ্যা যুদ্ধের নাটক, যা একটি চলমান জনসংখ্যাশূন্য কর্মসূচি থেকে বিশে^র মনোযোগ সরানোর লক্ষ্যে সাজানো হয়েছে। কভিড-১৯ টিকা সরবরাহের মাধ্যমে এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ইউক্রেনের সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা ‘এনডব্লিউও’-এর প্রসঙ্গগুলো টিকটকেও স্থান পেয়েছে। ইউক্রেনের এমপি কেরি রুডির সাক্ষাৎকারের ক্লিপটি ভাইরাল হওয়ার পর মার্চের শুরুতে টুইটারে এই শব্দগুচ্ছ ট্রেন্ডে পরিণত হয়।

‘ডিপ স্টেট’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গের অবতারণা করে আমেরিকান ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা বিশ্বব্যাপী দাবা বোর্ডে নিজেদের স্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে বরাবরের অস্পষ্ট অথচ বিশ্বাসযোগ্য একটি নয়া বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টাও জারি রেখেছেন।