লাখো মানুষ পানিবন্দি

সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সুরমা নদীর তীর উপচে পানি ঢুকে বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে সিলেট নগরীর বেশ কিছু এলাকা। প্রায় ১৮ বছর পর সিলেট নগরে বন্যার পানি ঢুকল। সুনামগঞ্জ শহরেরও নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

সিলেট জেলার সবগুলো উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে অনেক এলাকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, অনেক সরকারি কার্যালয়েও ঢুকেছে বন্যার পানি।

সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে। এছাড়া গত এক সপ্তাহ রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধান শুকাতে পারছেন না হাওরের কৃষকরা। ধান শুকাতে না পারায় পাকা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে।

সিলেট : সুরমার তীরঘেঁষা শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, ছড়ারপাড়, কালীঘাট, তালতলা, কাজিরবাজার, শেখঘাট, লালাদীঘিরপাড় এলাকার প্রায় সব বাসার নিচতলা এখন পানিতে ভাসছে। বন্যার পানিতে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। নগরীতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে। নগরীর বন্যাকবলিত মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র।

গতকাল মঙ্গলবার নগরীর বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। তারা জানান, নগরীতে এভাবে বন্যার পানি সচরাচর ঢুকতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ ২০০৪ সালে নগরীর অনেক এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। এরপর প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও এবারের মতো সুরমা উপচে নগরী বন্যাকবলিত হয়নি।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, সুরমা, কুশিয়ারা, সারি, লোভাসহ সিলেটের সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। অনেক জায়গায় পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। জেলার বাকি উপজেলাগুলোরও নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে।

সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহর, তেররতন, মেন্দিবাগ, মাছিমপুর, তালতলা, শেখঘাট, লালাদীঘিরপাড়, জামতলা এলাকার প্রধান সড়ক ও গলি বন্যার পানিতে ডুবে আছে। সোমবার রাতেই অনেকের বাসাবাড়িতে পানি ঢুকেছে। এ অবস্থায় অনেকে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। বাসার আসবাবপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। শাহজালাল উপশহর এলাকার বাসিন্দা সেলিম আহমদ জানান, তিনি পরিবার নিয়ে একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় থাকেন। সোমবার রাতে তার বাসায় পানি ঢুকতে শুরু করে। গতকাল সকালে কোমরসমান পানিতে থইথই করছে পুরো বাসা। স্ত্রী-সন্তানদের অন্যত্র পাঠিয়ে তিনি বাসার আসবাবপত্র রক্ষার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, ফ্রিজসহ অনেক মূল্যবান জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে।

ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষিকা কণিকা দাস জানান, সোমবার রাত থেকেই পানিবন্দি অবস্থায় বাসায় রয়েছেন। গতকাল পানি আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে তাদের দিন কাটছে।

কালীঘাট এলাকার ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া জানান, পানি ঢুকে তার দোকানের চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলুসহ অনেক পণ্য নষ্ট হয়েছে। তার দোকানে গতকাল বিকেলেও ছিল হাঁটুসমান পানি।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলার বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিলেট নগরীর বন্যা আক্রান্ত মানুষের জন্য ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলো হলো ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মিরাবাজারের কিশোরী মোহন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের চালিবন্দর রামকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয় ও চালিবন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাছিমপুরের আবদুল হামিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বুরহান উদ্দীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহজালাল উপশহরে তেররতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাজাঙ্গালের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাজিরবাজার স্কুল, মণিপুরি রাজবাড়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও মাছুদীঘি আশ্রয়কেন্দ্র, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাসিটুলা স্কুল, ইউনিসেফ স্কুল, কানিশাইল স্কুল, জালালাবাদ স্কুল, বেতেরবাজার কাউন্সিলর কার্যালয়ের চারতলা ভবন এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সুনামগঞ্জ : গতকাল বিকেলে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া বেড়েছে যাদুকাটা নদী ও হাওরের পানি। পানি ঢুকেছে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের নদী তীরবর্তী এলাকা সাহেববাড়ি ঘাট, বড়পাড়া, নবীনগর, উকিলপাড়া ও কালীপুর এলাকায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারতের মেঘালয়ে ভারী বর্ষণ হওয়ায় সুনামগঞ্জের সবকটি নদ-নদী ও হাওরের পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জ ও মেঘালয়ে ভারী বর্ষণ এবং সুনামগঞ্জেও প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বৃষ্টি আর উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আর যেসব মানুষ পানিবন্দি তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ত্রাণসহ শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আর হাওরে ধান কাটা শেষ তাই কাউকে ধান হাওরে শুকাতে না রাখার আহ্বান করা হয়েছে।