রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা প্রকল্পে মোট ৬০টি বাণিজ্যিক প্লটের মধ্যে ২৯টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ৩১টি বাণিজ্যিক প্লট প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। বেদখল হওয়া এসব প্লটের বেশিরভাগের আয়তন ১০ কাঠা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসংলগ্ন প্লটগুলো রাজউকের হিসাবে প্রতি কাঠা ৬ কোটি টাকা আর সোনারগাঁও জনপথ রোডসংলগ্ন প্লটগুলো সাড়ে ৩ কোটি টাকা দাম নির্ধারণ করা আছে। সেই হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তিদের অবৈধ দখলে থাকা প্লটের বাজারমূল্য কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা হবে।
৩১টি প্লটের ১৪টিতে মামলাসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। বাকি ১৭টি প্লট নিলামে বিক্রি করতে চায় রাজউক। মামলার জটিলতা কেটে যাওয়া সাপেক্ষে বাকিগুলোও নিলাম করা হবে। এরই মধ্যে সদস্যকে (এস্টেট) প্রধান করে নিলাম কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দীর্ঘ সময় অবৈধ দখলে থাকা জমি বিক্রি করে সংস্থাটি পাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
রাজউকের চেয়ারম্যান (সচিব) এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরা প্রকল্পে আমাদের যে ৬০টি বাণিজ্যিক প্লট রয়েছে সেখানে ২৯টি বিভিন্ন সময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩১টি প্লট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দখল করে রেখেছে। আমরা এসব প্লট উদ্ধারে নানামুখী উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। এগুলো উদ্ধার করে নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করব। এছাড়া রাজউকের মালিকানাধীন আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বাণিজ্যিক কিছু প্লট বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। সেগুলোও পর্যায়ক্রমে আমরা উদ্ধার করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যেখানে রাজউকের জমি বেদখলে আছে সেখানেই রাজউক উদ্ধার অভিযান চালাবে। কাজটি কঠিন হলেও রাজউক শক্ত হাতে তা করে যাবে।’
রাজউক দাপ্তরিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে অবৈধভাবে প্লটগুলো দখল করে রেখেছে। ৩১টি প্লটের জমির পরিমাণ কমবেশি প্রায় ৩১০ কাঠার মতো। এখানে রাজউক তিনটি ক্যাটাগরিতে জমির দাম নির্ধারণ করেছে কাঠাপ্রতি ৬ কোটি, সাড়ে ৩ কোটি ও কয়েকটি প্লটের ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এসব জমির বাজারমূল্য দাঁড়ায় কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা। এসব প্লটের মধ্যে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে রয়েছে ১২টি আর ১৩ নম্বর সেক্টরে রয়েছে ১৯টি। মামলাসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে ১১ নম্বর সেক্টরে তিনটি আর ১৩ নম্বর সেক্টরে ১১টিসহ মোট ১৪টি প্লটে।
রাজউকের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেহাত হওয়া জমিগুলো উদ্ধারের পর তা নিলামে বিক্রি করা হবে। প্লটগুলো হলো উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের ৯৭, ৯৯ ও ১০১ নম্বরের ১০ কাঠা প্লট। প্লটটি প্রতি কাঠা ৬ কোটি টাকা করে ৬০ কোটি টাকা আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে। বর্তমানে এ প্লটটির একটি অংশ বিজিবির দখলে অন্য অংশে মোটর পার্টের দোকান রয়েছে। একই সড়কে ৯১, ৯৩ ও ৯৫ নম্বর নিয়ে রয়েছে ১০ কাঠার আরেকটি বাণিজ্যিক প্লট। সেটিও অবৈধ দখলে রয়েছে। যা ৬০ কোটি টাকা মূল্য ধরা হয়েছে। প্লট নম্বর ৭৩ ও ৭৫ ১০ কাঠা আয়তনের। সেটিও ৬০ কোটি টাকা দাম ধরা হয়েছে। ৬ নম্বর সেক্টরের ২০, ২১, ২১/এ প্লটটি ২০ কাঠা আয়তনের। এটির মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি কাঠা ৬ কোটি করে মোট ১২০ কোটি টাকা। ১৩ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠার প্লট প্রতি কাঠা ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে ৩৫ কোটি টাকা। ১১ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠার প্লটটিও ৩৫ কোটি দাম ধরা হয়েছে। সোনারগাঁও জনপথের ৫৪, ৭৪ ও ৮৪ নম্বর রোডের প্লটটি ১০ কাঠা আয়তনের। এ প্লটের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। একই রোডের ২৭, ২৯, ৩১, ৩৩, ৩৫, ৪৩, ৪৫, ৪৯, ৭১, ৭৩ ও ৭৫ নম্বর মিলে একটি বাণিজ্যিক প্লট। ১০ কাঠা আয়তনের এ প্লটটিও ৩৫ কোটি টাকা দাম ধরা হয়েছে। এছাড়াও সোনারগাঁও ও জনপথ রোডের ৪২, ৪৪, ৪৭, ৪৮, ৫০, ৫৬, ৫৭, ৫৮, ৫৯, ৬১, ৬৩, ৬৫, ৬৬, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮২ ও ৮৪ নম্বর প্লটগুলোও অবৈধ দখলে রয়েছে। এ প্লটগুলোতে বেশিরভাগ দখল করে ফার্নিচারের দোকান বসানো হয়েছে। কিছু কিছু প্লটে বেডিংস্টোর, গাড়ির ওয়ার্কশপ ও কাঁচাবাজার বসিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল।
৩ নম্বর সেক্টরে ২ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর প্লটটি রয়েছে ১৫ কাঠা আয়তনের। এ প্লটটির বর্তমান বাজারমূূল্য ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ৭৫ লাখ। ২ নম্বর সড়কের ৫২ নম্বর প্লটটি চার কাঠার। সেটি দাম ধরা হয়েছে ৫ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ প্লটগুলো উদ্ধার করতে বোর্ড সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, একটি প্লটে একাধিক মামলার মতো ঘটনাও রয়েছে। দুটি সেক্টরে বেশ কিছু মামলার তথ্য পাওয়া যায়। বোর্ড সভার চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য মামলাগুলো মোকাবিলায় কঠোর আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন। আশা করা যাচ্ছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রাজউক তাদের বাণিজ্যিক প্লটগুলোর দখল ফিরে পাবে। দখল পাওয়া সাপেক্ষ তা নিলামে বিক্রি করা হবে। আর যেগুলোতে মামলা নেই সেগুলো নিলাম করার জন্য ইতিমধ্যে একটি কমিটি কাজ করছে। এ নিলাম কমিটির প্রধান করা হয়েছে সদস্য (এস্টেট) মনির হোসেনকে।