ফের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয়

বিদ্যুতে ভর্তুকি না দিলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর যে সুপারিশ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) করেছে তা উদ্বেগজনক। দেশ রূপান্তরে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, যদি ভর্তুকি না দেয় সরকার, তাহলে সুপারিশকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দাম দাঁড়াবে ৮ টাকা ১৬ পয়সা। বিইআরসি বলেছে, পাইকারি দাম না বাড়লে ২০২২ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। এ লোকসান থামাতে সরকার যদি ভর্তুকি দেয় তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুতের বর্তমান দামই বহাল থাকবে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ১৭ পয়সা। প্রতি বছর সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। গত বছরও এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

সহজ হিসাবেই বলা যায়, পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে গ্রাহকপর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দামও বাড়বে। এর আগে সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ইউনিটপ্রতি ৫.১৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। গত এক যুগে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১১৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং খুচরা দাম প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ২.১৩ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.১৬ টাকায়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, কয়লার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির কারণে চলতি বছর ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে ৪.২৪ টাকা। এখন পাইকারি দাম না বাড়লে এ বছর ৩০ হাজার ২৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান হবে পিডিবির।

বিদ্যুতের এই দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে পড়বে তা নয়, কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও এতে বৃদ্ধি পাবে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে হতাশার কথা জানিয়েছেন। এমনিতে সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। বেশির ভাগ সূচকই নিম্নগামী। বিশ্ব অর্থনীতিও মন্দার আশঙ্কায়। কমে যাচ্ছে সামগ্রিক চাহিদা। এ রকম একটা সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় প্রশ্ন উঠেছে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও। ২০০৯-১০ সালে আপাত-সংকট কাটাতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো চালু করেছিল। উৎপাদন-ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে সরকার তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনেছে। দেশের শিল্প-কারখানা বাঁচিয়ে রাখতে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সে সময় কুইক রেন্টালের প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী যেখানে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, সেখানে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই।

বিগত ১২ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও সাধারণ মানুষকে বেশি দাম দিয়েই বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, লোকসান কমাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার যদি বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে, সে ক্ষেত্রে লোকসান অযৌক্তিক নয়। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার সময়ও সেসবের ভাড়া বা ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে গিয়ে সরকারের লোকসান কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। অথচ সরকার বরাবর গ্রাহকের কাছ থেকেই ভর্তুকির টাকা আদায়ের সহজ পথ বেছে নিয়ে বিকল্প পন্থা গড়ে তোলার কথা ভাবছে না। লক্ষ করা দরকার, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জ্বালানির ‘মূল্য সমন্বয় তহবিল’ গঠন করছে না। অন্যদিকে, বিপিসি তেল বেচে গত কয়েক বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লাভ করলেও সরকার আইন করে বিপিসিসহ জ্বালানি খাতের সরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। একদিকে, সরকার বাজেট ঘাটতি মেটানোসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে গিয়ে জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলো দুস্থ বানিয়ে ফেলছে; অন্যদিকে, দফায় দফায় জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম বৃদ্ধির চাপে জনগণের নাভিশ্বাস উঠছে। এই পরিস্থিতির অবসান না হলে দেশের জ্বালানি খাতেরও বিকাশ হবে না আর জনগণের মাথায় জ্বালানির বোঝাও কমবে না।

পাশাপাশি, তথাকথিত সিস্টেম লস, যার আড়ালে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে, সেটা হ্রাস করা গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার পড়ে না। এ খাতে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দেশে যখন রপ্তানি আয়ে মন্দা চলছে, বিনিয়োগ পরিস্থিতিও যখন ভালো নয়, তখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।