২৮ মাসে সড়কে নিহত ১৬৭৪ শিশু

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগেও আশানুরূপ সুফল মিলছে না। কমছে সড়কের নৈরাজ্য। এ নৈরাজ্যের কারণে শিশুরাও অস্বাভাবিক হারে দুর্ঘটনাকবলিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুহার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ২৮ মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৬৭৪ শিশু নিহত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত ২৮ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শিশু মারা গেছে রাস্তা পারাপার ও রাস্তা ধরে হাঁটার সময়। এমন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ২৭ শিশু। এদের মধ্যে আছে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় নিহত হওয়া শিশুর সংখ্যাও। আলোচ্য সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় নিহত হয়েছে ৭৩১ শিশু। বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় নিহত হয়েছে ১৯৩ শিশু, বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৩৩১, ট্রাক, পিকআপ, ট্রাক্টর, ড্রামট্রাক ইত্যাদি পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও সহকারী হিসেবে নিহত হয়েছে ৪৮ আর মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ২৬৮ শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরালে দিনের পর দিন এ দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। দেশের সড়ক ও সড়ক পরিবহন এখনো শিশুবান্ধব হয়ে ওঠেনি। সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাছাড়া শিশুরা কাঠামোগত দিক থেকে দুর্ঘটনার ধাক্কা সামলাতে পারে না।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, যাত্রী হিসেবে শিশু নিহতের যানবাহনভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাসযাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৭২ শিশু (২১.৭৫ শতাংশ) প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী হিসেবে ২৫ শিশু (৭.৫৫ শতাংশ), থ্রি-হুইলার (সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ইত্যাদি) যাত্রী হিসেবে ১৮৩ শিশু (৫৫.২৮ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের (নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র, টমটম ইত্যাদি) যাত্রী হিসেবে ৫১ শিশু (১৫.৪০ শতাংশ) নিহত হয়েছে।

এদিকে যানবাহনের চাপায় ও ধাক্কায় শিশু নিহতের ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পণ্যবাহী যানবাহনের (ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ড্রামট্রাক, ট্রাক্টর, ট্রলি ইত্যাদি) ধাক্কায় নিহত হয়েছে ২৫৮ শিশু। বাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১৪৩, থ্রি-হুইলারের (সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ইত্যাদি) ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩২১, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের (নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র, টমটম ইত্যাদি) চাপায়/ধাক্কায় নিহত হয়েছে ২০৮ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায়ও নিহত হয়েছে ৯৭ শিশু।

দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহাসড়কে ২৮৭, আঞ্চলিক সড়কে ৩২৮, গ্রামীণ সড়কে ৮৮৯, শহরের সড়কে ১৪৭ এবং অন্যান্য স্থানে নিহত হয়েছে ২৩ শিশু।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ দেখা যায়, শিশু নিহত হওয়া দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ১.৫৫ শতাংশ, সকালে ৫১.৭৯ শতাংশ, দুপুরে ১৩.৩২ শতাংশ, বিকেলে ২২.৪৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৬.৫১ শতাংশ এবং রাতে ৪.৩৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ দেখা যায়, ১ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৩৩৭, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৭৫৪ এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ৫৮৩ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুরা সড়ক ব্যবহারের কোনো নিয়মনীতি জানে না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে যেমন কোনো উদ্বেগ নেই, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো প্রকার সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এ অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নীরবে আমাদের শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’

এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীতে চলাচলের মতো সেভাবে ফুটপাত এখনো গড়ে ওঠেনি। আর যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগ হকারদের দখলে। তাই হকারদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন করে ভালো ফুটপাত করা প্রয়োজন। তা না হলে দেখা যাবে শিশুরা রাস্তায় দিয়ে চলার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সামনে আরও বেশি মৃত্যুর ঘটনা বাড়বে। তাছাড়া আমাদের মহাসড়কে প্রতি ৫০০ মিটার পরপর আন্ডারপাস করা প্রয়োজন। কিন্তু মহাসড়কে সেভাবে আন্ডারপাস নেই। সেজন্য মহাসড়কে ধীরে ধীরে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার থেকেও শিশুদের সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তবে দেশের সড়ক কাঠামো এখনো সেভাবে ঠিক নেই।’ এ সড়ক কাঠামো ঠিক করা গেলে দুর্ঘটনা অনেক অংশে কমে যাবে বলে জানান তিনি।