জরুরি পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

পদ্মা সেতুর নাম পরিবর্তন হবে না

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার চাপ মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে বিশেষ বৈঠক করে সিদ্ধান্ত জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাভাইরাস মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে বিশেষ করে নিত্যপণ্যের ও টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়তির মুখে এ ধরনের নির্দেশনা এলো।

সচিবালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভা বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘একসঙ্গে বসে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করা যায় তা ঠিক করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে বসে বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’ বৈঠকের বিস্তারিত তুলে তিনি জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে কতগুলো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত এবং সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়ে সবার কাছে তুলে ধরার জন্য। বিশেষ করে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে বা সরবরাহ কমে যাচ্ছে বিষয়গুলো সরকার কীভাবে হ্যান্ডেল (পরিচালনা) করতে পারবে। কোন জায়গায় রেস্ট্রিকশন (বিধিনিষেধ) দিলে ভালো হবে। এগুলো দু-তিন দিনের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তুলে ধরতে হবে। এছাড়া ডলারের যে ক্রাইসিস (সংকট) হচ্ছে এটা কীভাবে সমাধান করা যায় এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বসে দু-তিন দিনের মধ্যে গণমাধ্যমে জানানো হবে।

দেশে প্রতি বছর ৮ বা ৯ হাজার কোটি টাকার ফল আমদানি হয় জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ৯ হাজার কোটি টাকা কম টাকা নয়। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস বাজারভর্তি আম, জাম, কাঁঠালে। এ অবস্থায় ফল আমদানির ওপর কর কমানো-বাড়ানোর প্রস্তাব আসতেই পারে। এ ধরনের প্রস্তাব বিবেচনা করে অর্থ, বাণ্যিজ্য ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে গঠনমূলক সংবাদ পরিবেশনের অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আপনাদের কাছেও আমাদের আবেদন গঠনমূলকভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরুন। কভিড রিকভার করা যাচ্ছিল কিন্তু ইউরোপের যুদ্ধটা বিশ^ অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করেছে। রাশিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো খাদ্য ও জ¦ালানিতে উদ্বৃত্ত। কিন্তু এ অঞ্চল থেকে খাদ্য ও জ¦ালানি বের হতে পারছে না। এতে সারা বিশ্বই ভুগছে। ৯ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি গ্রেট ব্রিটেনে। যুক্তরাষ্ট্রে ৮ শতাংশের বেশি। আমরা তো বিশে^র বাইরে না। আমাদেরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও রেশনাল বিহেভ করতে হবে। এজন্য আমরা মিডিয়াকে অনুরোধ করব একটু পজিটিভওয়েতে প্রচার করার জন্য। আমরা সবাই যেন একটু সাশ্রয়ী থাকি বা রেশনাল থাকি।’

পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শেষে উদ্বোধনের জন্য এখন প্রায় প্রস্তুত। কবে এ সেতু উদ্বোধন হবে তা নিয়ে নানা জল্পনার মধ্যে মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর জানানো হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই উদ্বোধনের তারিখ ঠিক করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘পদ্মা সেতুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই পরিষ্কার করবেন আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে। পদ্মা সেতু জুন মাসের শেষদিকে উদ্বোধন হচ্ছে, এটা তিনি বলেই দিয়েছেন। আশা করি শেষ সপ্তাহের আগেই ব্রিজ রেডি হয়ে যাবে।’

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েক দিন আগেই বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। জুন মাসের শেষ ভাগে তা উদ্বোধন হবে।

পদ্মা সেতুর নাম কী হবে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন পদ্মা সেতুই হবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে যেকোনো সময় সব বিষয় পরিষ্কার করবেন।’

পদ্মা নদীর বুকে নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতুর কাজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

পদ্মা সেতুর নির্ধারিত টোল বেশি হওয়া নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে, সে বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘টোল নির্ধারণের নির্দিষ্ট ফর্মুলা রয়েছে। যখনই যেখানে ব্রিজ করা হয় সেখানকার ব্রিজের টোল নির্ধারণ হয় ফেরির দেড়গুণ। এ স্ট্যান্ডার্ড ধরেই পদ্মার টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতু হলো প্রায় ৫ কিলোমিটার আর পদ্মা সেতু হলো ৯.৮৬ (সংযোগ সড়কসহ) অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। তাছাড়া ফেরির যে চরিত্র, সেটা যমুনার মতো নয়। বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল ধরা হয়েছে ১৯৯৫-৯৬ সালে। তারপর দুবার বাড়ানো হয়েছে। পদ্মার টোল বর্তমান টোলের হার ধরে করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে যদি মনে করা হয় টোল হার বেশি হয়েছে তাহলে হয়তো...’ বক্তব্য অসমাপ্ত রাখেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

সচিব আরও জানান, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় বলা হয়েছে ২৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে টাকাটা (পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়) উঠে আসবে। এখন মনে হচ্ছে ১৬-১৭ বছরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে। পদ্মার ওই পাড়ের কিছু কাজকর্ম সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আসেনি। এ সেতু নির্মাণের পর মোংলা বন্দর যে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বা পায়রা বন্দর হবে, এত শিল্পায়ন হবে এগুলো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে উঠে আসেনি। ধারণা ছিল পদ্মা সেতু ১ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি আনবে। এটা ২ শতাংশের কাছাকাছি চলে যাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে। পদ্মা সেতুর টাকা সেতু কর্তৃপক্ষকে ১ শতাংশ হার সুদে সরকারকে ফেরত দিতে হবে। সুতরাং সেতু কর্তৃপক্ষকে ওই অবস্থান থেকে টাকা উপার্জন করতে হবে। পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের স্থাপনার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় টাকা-পয়সা না দিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, করোনাভাইরাস মোকাবিলার সাফল্যে স্বাস্থ্য খাতের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দেবে বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিষয়ে একটি পর্যালোচনা করেছে। এতে তারা কভিড মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে। এজন্য তারা বাংলাদেশকে ৯৪৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।

তিনি আরও জানান, সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোথাও হাটবাজার স্থাপন করা যাবে না এমন বিধান রেখে ‘হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ব্যক্তিমালিকানায় কোথাও হাটবাজার স্থাপন করা হলে তা সরকার অধিগ্রহণ করবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি জানান, খসড়া আইন অনুযায়ী কেউ সরকারি খাসজমিতে হাটবাজার স্থাপন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। ভূমি উন্নয়ন কর আইনের খসড়ারও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।