দেশের বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) জিজ্ঞাসাবাদ করার পরিকল্পনা নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশ সদর দপ্তর। আগামী সপ্তাহে পুলিশ ও দুদকের আলাদা দুটি দল কলকাতায় যাওয়ার কথা রয়েছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সদস্যও থাকবেন। ইতিমধ্যে এ দুটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কলকাতায় যোগাযোগ করেছেন। তাছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা-এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
গত ১৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরে নিজের বাড়ি থেকে পি কে হালদারকে গ্রেপ্তার করে ইডি। আগের দিন থেকে চালানো অভিযানে পি কে হালদারের আরও পাঁচ সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে এক নারীও রয়েছেন। এ নারী ছাড়া বাকিরা দ্বিতীয় দফায় ইডির কাছে ১০ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকে এসে পি কে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে ইডি সব ধরনের সহায়তা করবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
পি কে হালদারের মামলার তদন্তের স্বার্থে ভারতকে আরও তথ্য দিতে এবং তাকে দেশে ফেরত আনতে দুদক একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার পাশাপাশি কয়েকটি সংস্থার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও পি কে ও তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছে দুদক। এ নিয়ে ৪০টি মামলা করা হলো তাদের বিরুদ্ধে।
জানতে চাইলে পি কে হালদারের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরও তথ্য উদঘাটন করতে ব্যাপক অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ভারত থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুদক চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই দেশে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। এজন্য আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, দুদকের পাশাপাশি পুলিশও পি কে হালদার নিয়ে কাজ করছে। দুদিন আগে ইডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের। ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির পাশাপাশি পুলিশের কাছে যেসব তথ্য আছে সেই বিষয়ে ওই কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, রিমান্ডে পি কে হালদার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। তার তথ্যে তারাও হতবাক। দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতায় ছিলেন বলে জেরায় জানিয়েছেন তিনি। তাকে কলকাতায় একাধিক প্রভাবশালী সহযোগিতা করেছে। তাদের নামও পেয়েছে ইডি। ইডির ওই কর্মকর্তা বাংলাদেশের পুলিশকে আরও জানিয়েছেন যে, পি কে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সব ধরনের সহায়তা করবেন তারা। দুদকের সঙ্গে সমন্বয় করেই পুলিশ কাজ করছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, পি কে হালদারের বিষয়ে ভারতকে আরও তথ্য দিয়ে সহায়তার পাশাপাশি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কমিটি করেছে দুদক। কমিটিতে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও গুলশান আনোয়ার প্রধান। কমিটি দেশে ফেরানোর আইনগত বাধা দূরীকরণে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আপাতত দুই সদস্যের কমিটি করা হলেও প্রয়োজনে কমিটির সদস্যসংখ্যা পাঁচজন পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, দুদকের পাশাপাশি পুলিশ ও বিএফআইইউ কয়েকজন কর্মকর্তা পি কে হালদারকে জেরা করতে কলকাতায় যাবেন বলে আশা করছেন তারা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ কাজটি সম্পন্ন করা হবে। ইডিও তাদের কাছে তথ্য চেয়ে সহযোগিতা চাচ্ছে। তারাও ইডিকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারের আগে পি কে হালদারের বিষয়ে আগাম তথ্য দিয়ে রেখেছিলেন তারা। তিনি আরও বলেন, ভারতে পাচার করা অর্থ-সম্পদের খোঁজ করতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিএফআইইউ, ইন্টারপোলের ঢাকায় ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ডেস্কের মাধ্যমে ভারতের নয়াদিল্লির এনসিবি ডেস্কে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বেআইনি অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য দিতে না পারলে পি কে হালদারের ভারতের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছরের এবং সর্বনিম্ন তিন বছরের জেলও হতে পারে। নানান ধরনের অপরাধ বিবেচনায় আলোচিত এ মামলাটি ইডি তদন্ত করার পর ভারতের কেন্ত্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইর হাতে যেতে পারে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা মনে করেন, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ফারমার্স ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক লোপাট হওয়া, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা উধাও হওয়ার ঘটনাগুলো দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে পারলে পি কে হালদারের মতো আর কেউ জন্মাবে না। আর না হয় এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত ১৪ মে পি কে হালদারের গ্রেপ্তারের পর পাঁচ দিন কেটে গেছে। ইতিমধ্যেই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তার আর্থিক সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনে আর কোন কোন সহযোগী বা রাঘব বোয়ালের হাত রয়েছে ইডি তারও একটা ইঙ্গিত পেয়েছে।
দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাদের (ভারত) কাছেও মামলা রয়েছে, সে বিষয়টিও দেখতে হবে। আমরা যদি পি কে হালদারকে আনতে পারি, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে রাঘব বোয়াল কারা কারা আছে, কে কে দায়ী সব জানা যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, পি কে হালদার একা এত বড় দুর্নীতি করতে পারেন না। কারও না কারও যোগসাজশ রয়েছে। কেউ অবশ্যই সহযোগিতা করেছে। কারা করেছে, তাদের ধরার জন্য চেষ্টা করব। কিছু লোকের তালিকা আমাদের কাছে আছে। তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
আরেকটি মামলা : পি কে হালদারসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। মামলায় কাগুজে প্রতিষ্ঠান দিয়া শিপিং লিমিটেডের নামে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে ৪৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। গতকাল দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ সংস্থাটির সহকারী পরিচালক রাকিবুল হায়াত বাদী হয়ে মামলাটি করেন। অন্য আসামিরা হলেন দিয়া শিপিং লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিবপ্রসাদ ব্যানার্জি, পরিচালক পাপিয়া ব্যানার্জি, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান এমএ হাফিজ, সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক অরুণ কুমার কুন্ডু, অঞ্জন কুমার রায়, মো. মোস্তাইন বিল্লাহ, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সত্য গোপাল পোদ্দার ও এফএএস ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহরিয়ার। মামলার অন্যতম আসামি এফএএস ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি রাসেল শাহরিয়ারকে ১৫ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।