আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রয়াণের খবর এমন সময়ে শুনলাম যখন আমি নিজেও দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। গত প্রায় আড়াই বছরে করোনা মহামারীর এ সময়ে আমরা অনেককেই হারিয়েছি। কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে আবার কেউ করোনায় মারা গেছেন। এখন খবর পেলাম গাফ্্ফার চৌধুরীও অনন্তলোকে যাত্রা করেছে। আমি ভাবছি, বয়সে তাদের চেয়ে বড় হয়েও আমি কেন রয়ে গেছি! অল্প সময়ের মধ্যে কামাল লোহানী থেকে শুরু করে অনেকেই মারা গেলেন। গাফ্ফার চৌধুরী তাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম একজন। আনিসের (আনিসুজ্জামান) কথা মনে পড়ে গাফ্্ফার চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে। গাফ্ফার আমার চেয়ে বয়সে ৬-৭ বছরের ছোট। গাফ্ফারদের আত্মপ্রকাশের যে সময় অর্থাৎ, পঞ্চাশের দশক সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসেই একটি উল্লেখযোগ্য সময়। একই সময়ে অনেক মেধাবীর আবির্ভাব হয়েছিল সে সময়। শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমানদের সময় সেটি। তারা ছাড়াও আরও মেধাবী সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের আমরা সে সময়ে পেয়েছি। পঞ্চাশের দশককে বাংলাদেশের ও বাংলা সাহিত্যের মেধাবীর যুগ বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না।
আমি ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৪৯ সালে, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় আমি মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলাম। আনিস (আনিসুজ্জামান) ও নিয়ামুল বশীর ছিল জগন্নাথ কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। তারা থাকত পুরান ঢাকার একটি মেসে। সেখানে বেশ কিছু বাড়িতে তখন মেস বানিয়ে ছাত্ররা থাকত। সেখানেই একটি মেসবাড়ির নাম ছিল ‘বান্ধন কুটির’। গাফ্্ফার চৌধুরী ছিল ঢাকা কলেজের ছাত্র। কিন্তু ঢাকা কলেজের ছাত্রদের তখন থাকার জন্য ছাত্রাবাস ছিল না। গাফ্ফার চৌধুরীও তখন সে মেসে থাকত। ওই সময় ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোতে আনিস (আনিসুজ্জামান) মাঝেমধ্যে ঢাকা মেডিকেলে আমাদের হোস্টেলে আসত। তখন গাফ্্ফারও আসত। নইলে গাফ্ফারের সঙ্গে পরিচয় হতো না। আমি আনিসকে (আনিসুজ্জামানকে) যেহেতু তুমি করে বলতাম, তাই আনিসের সঙ্গে আসতে দেখে গাফ্্ফার চৌধুরীকেও একই রকম সম্বোধন করতাম। পরে ভাষা আন্দোলনের পর গাফ্্ফারকে আমরা পেলাম নতুনভাবে। ভাষাশহীদদের স্মরণে গাফ্্ফার রচনা করল কবিতা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ এই কবিতায় সুর দিলেন আলতাফ মাহমুদ। এই কবিতা হয়ে উঠল গান। এই গান এখন আমরা গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মিশিয়ে গাই। এই গানই গাফ্্ফারকে অমরত্ব দেবে। এই গানের জন্যই গাফ্ফার চৌধুরী অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এরপর আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে যদি তাকাই, সেখানেও দেখব তার অংশগ্রহণ। মুজিবনগর সরকারের স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক জয় বাংলার প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও গাফ্্ফার দায়িত্ব পালন করেছে। তাই ভাষা আন্দোলনের অমর গান রচয়িতা গাফ্্ফারকে আবার আমরা দেখতে পাই নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শামিল হতে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গাফ্ফার চৌধুরীর অংশগ্রহণ সব সময়ই ছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর গাফ্ফার লন্ডনে গিয়েছিল। এরপর থেকে সেখানেই স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু তার লেখালেখি থামেনি। একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে প্রায় শেষ সময় পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
গাফ্ফার প্রথম জীবনেই সাংবাদিকতা শুরু করেছিল। তখন একজন সাংবাদিকই ছিল কেবল। এরপর পত্রিকার কলাম লেখক হিসেবেও গাফ্ফার খ্যাতি অর্জন করে। আবার গাফ্ফার সাহিত্যিকও ছিল। শুধু সাহিত্যিক নয়, তাকে সুসাহিত্যিক বলতে হবে। একই সঙ্গে কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস লিখেছে। আবার আত্মজীবনীও লিখেছে। ইতিহাসটা তাই ধরা যায় গাফ্ফারের লেখার দিকে তাকালে। গাফ্ফার শুরুর দিকে কবিতা লিখলেও বই করার বিষয়ে মনোযোগী দেখা যায়নি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন সময় বেশ কিছু কবিতা লিখেছে। পরে অবশ্য বই হয়েছে। চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, কৃষ্ণপক্ষ গাফ্ফারের এসব বইয়ের নাম এখন মনে পড়ছে। গাফ্ফার সাংবাদিক হিসেবে কলাম লেখার মধ্য দিয়ে যে খ্যাতি অর্জন করেছিল, তা ঈর্ষণীয়। সাহিত্যিক হিসেবেও তার সৃষ্ট সাহিত্যকর্মের মূল্য কম নয়। আবার একুশে ফেব্রুয়ারির গানের গীতিকার হিসেবে এরই মধ্যে অমরত্ব পেয়েছে বলা যায়। বাঙালি ও বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, মানুষ তত দিন গাইবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গান। এর মধ্য দিয়ে একজন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকেও আমরা ভুলতে পারব না। গাফ্ফার আমাদের মধ্যে চিরস্মরণীয় হয়েই থাকবে।
লেখক : ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক