শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক হাজার মাদ্রাসা ও ১১৬ ইসলামি বক্তার তথ্য দিয়ে ‘ধর্ম ব্যবসায়ীদের’ দুর্নীতির তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন’। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং জাতীয় সংসদের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক ককাসের যৌথ উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে এ গণকমিশন। পাশাপাশি গণকমিশন এসব মাদ্রাসা ও ইসলামি ব্যক্তিদের দুর্নীতিসংক্রান্ত একটি শ্বেতপত্রও দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিয়েছে। গণকমিশন ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে কথা বলেছেন এ গণকমিশনের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : আমরা গণকমিশন গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করব। তবে শুরুতেই একটি বিষয়ে জানতে চাই, আপনিও অবগত আছেন নিশ্চয়ই (শুক্রবার) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গণকমিশনের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব আমাদের এ তদন্ত কাজের রিপোর্ট বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন। প্রায় তিন মাস আগে। সেদিন তিনি আমাদের কাজের প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, এ তদন্ত রিপোর্ট সরকারের সহায়ক হতে পারে। এখন আবার তিনি যা বলছেন, এ বিষয়ে বলতে হবে এটা আপসমূলক কথা। সরকার এদের সঙ্গে আপসমূলক ভূমিকা দেখাচ্ছে। আমি বলব, অবশ্যই সরকার এদের সঙ্গে আপসমূলক ভূমিকা দেখাচ্ছে। এর আগে যেমন সরকার হেফাজতের অনেক দাবি মেনে নিয়েছিল। হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী যারা তাদের লেখা বাতিল করা হয়েছে। এটা হয়েছে সরকারের আপসমূলক চরিত্রের জন্য। আবার আমরা ইউটিউবে বা অন্য অনেক মাধ্যমে ওয়াজের নামে তারা প্রতিদিন বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এটা আইনের চোখে অপরাধ। তবুও সরকার তাদের ধরছে না।
এবার আসি গণকমিশনের আইনি ভিত্তি নিয়ে। আমরা তো কখনো বলিনি এটি একটি আইনি বিষয়। আমরা শুধু আমাদের অনুসন্ধান ও কিছু সুপারিশ জমা দিয়েছি। এটা চাইলে যেকোনো সংগঠন বা কমিশনই করতে পারে। এটা কোনো আইন নয়। যে কেউ এটা করতে পারে। আমরা তথ্য হিসেবে অনেক অভিযোগ জমা করেছি। প্রমাণ আছে এখানে। এখন এ তথ্যকে ব্যবহার করে দুদক বা অন্য যে কেউ ব্যবস্থা নিতে পারে।
দেশ রূপান্তর : এক হাজার মাদ্রাসা এবং ১১৬ আলেমের তালিকা কেন করলেন?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : প্রথমেই বলতে চাই এখানে যাদের নাম আমরা দিয়েছি, প্রত্যেকের ব্যাপারেই আমরা অনুসন্ধান করে যে ফলাফল পেয়েছি, তার ভিত্তিতে দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি। এখানে একটি বিষয় সহজেই সবার বোঝা দরকার, সেটি হলো মানি লন্ডারিং। মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্র খুবই বিস্তৃত। মানি লন্ডারিং যে হচ্ছে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তারা বিদেশি বিভিন্ন মৌলবাদী সংস্থা থেকে টাকা নিচ্ছে। পাকিস্তান দূতাবাস ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তান দূতাবাসের এক কর্মীকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। সেই ঘটনার প্রমাণ আছে তো! এই যে যারা ওয়াজ করে, বিভিন্ন সময়ে মাহফিলের নামে টাকা তোলা হয়। দুর্নীতির সংজ্ঞা অনেক বিস্তৃত। মানি লন্ডারিং বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হবে এই হুজুরদের টাকার হিসাব পরিষ্কার নয়। তারা যেভাবে টাকা তোলে তা অবৈধ। ওয়াজের নামে যে টাকা তোলা হয় তার হিসাব থাকে না। এ টাকার ব্যয়ের খাতও পরিষ্কার নয়। তারা তাদের এ ওয়াজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নানা উপায় বের করেছে। একজন আছেন হেলিকপ্টার হুজুর। হেলিকপ্টার ছাড়া তিনি ওয়াজ করতে যান না। আবার এ ওয়াজের নামে দেশে ঘৃণা ছড়াচ্ছে তারা। অন্য ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করছে। বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তারা তালেবানি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের ওয়াজে এ মনোভাব দেখা যায়। আমরা জানি তারা একাত্তরের পরাজিত শক্তি।
দেশ রূপান্তর : যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছেন তারা প্রশ্ন তুলেছেন এ তদন্তের অথরিটি আপনাদের নেই। এ বিষয়ে কী বলবেন...
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : অবশ্যই আমাদের অথরিটি আছে। তারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছে। মন্দির ভেঙেছে। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা এগুলো দেখব না? এখানে অথরিটি না থাকার তো কিছু নেই।
দেশ রূপান্তর : আপনারা বলছেন তালিকার এসব ব্যক্তির জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এটা আপনারা কীভাবে খুঁজে বের করলেন? এটা রীতিমতো গবেষণার পাশাপাশি, দীর্ঘ তদন্তের বিষয়। আবার আইনগত অনুসন্ধানেরও প্রয়োজন ছিল এতে। এ কাজ আপনারা কতদিনে ও কীভাবে করলেন?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আমরা গত বছর হিন্দুদের ওপর নির্যাতন শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন জেলা সফর করেছি। সারা দেশের ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য নিয়েছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়েছি। এছাড়া দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। ইউটিউবে এসব ধর্ম ব্যবসায়ীর ওয়াজ শুনেছি। এরা কোনো অবস্থাতেই ইসলামের প্রচারক হতে পারেন না। আমরা যাদের নাম দিয়েছি, এ ধর্ম ব্যবসায়ীদের কেউ ওয়াজের নামে ১ লাখ টাকা নেয়। কেউ কেউ ৭০ হাজার, কেউ ৮০ হাজার টাকা নেয়। এসব ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। তারা তো আসলে ইসলামবিরোধী কাজ করছে। আবার তারা ট্যাক্স দেয় না। তারা দেশবিরোধী কাজ করছে। তাই তারা আসলে ধার্মিক নয়, ধর্ম ব্যবসায়ী। আমরা ৯ মাস কাজ করেছি। কুমিল্লার ঘটনার পর একজন ধর্ম ব্যবসায়ী, আব্বাসি যার নাম। যিনি প্রথমে বলেছিলেন, হিন্দুরা এ কাজ করেছে। তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মামলা হয়েছে। সে কিন্তু কুমিল্লার ঘটনার পরই বলেছিল এটা হিন্দুরা করেছে। তারপর সারা দেশে হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও আগেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। আরেক ধর্ম ব্যবসায়ীর কথায় এহসান গ্রুপে মানুষ ১৭ হাজার কোটি টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে। এখন এ প্রতারকরা জেলে আছে। এসব তথ্য আমরা সংগ্রহ করেছি, জমা দিয়েছি।
দেশ রূপান্তর : আপনারা যেসব ইসলামি বক্তাদের তালিকা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অপব্যাখ্যা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। আপনাদের গণকমিশনে কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ আছেন কি যারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আমাদের গণকমিশনের কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার ৩২ জন নাগরিক আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইসলামি মাওলানাও আছেন। এছাড়া আইন ও সামাজিক বিশেষজ্ঞ আছেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রাধান্য আছে, যারা গত কয়েক দশক ধরে এ ধরনের গবেষণা করছেন। এছাড়া পাঁচজন সংসদ সদস্য আছেন। রয়েছে মাইনরিটি ও আদিবাসী ককাস। এখানে আমি আরেকটি বিষয়ে বলতে চাই। প্রায় প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখা যায় মাদ্রাসার শিক্ষকরা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বলাৎকার করছে। মাদ্রাসাগুলো যেন বলাৎকারের কারখানা হয়ে আছে। এখন এদের আপনি ধার্মিক বলবেন কী করে?
দেশ রূপান্তর : বলাৎকার বা ধর্ষণ তো মাদ্রাসার বাইরেও হয়। এটা যেমন গ্রামে হয়। আবার শহরেও হয়। আবার সাধারণ প্রাইমারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও হয়। সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়।
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : না। আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি বলাৎকারের ঘটনা মাদ্রাসাতেই হয়।
দেশ রূপান্তর : দুদক ছাড়া স্বরাষ্ট্র বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আপনারা কোনো অভিযোগ দিয়েছেন কি? আপনাদের গণকমিশনের সুপারিশে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়েও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে ও কারিকুলাম নিয়ে সুপারিশ ও প্রস্তাব আছে তাই এ বিষয়ে জানতে চাই।
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তিন মাস আগেই প্রতিবেদনটি দিয়েছিলাম। তিনি তখন ব্যবস্থা নেবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন বলেও জানিয়েছিলেন। যখন পাঠ্যপুস্তক বদলে ফেলা হলো হেফাজতের দাবির মুখে, সেই সময় থেকেই আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে আসছিলাম। তাদের জানিয়েছিলাম, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার করে সেটা না বদলালে দেশের মধ্যে একটি সমস্যা স্থায়ী হয়ে যাবে।
দেশ রূপান্তর : আপনারা যাদের তালিকা করেছেন, ‘ধর্মব্যবসায়ী’ বলছেন, তারা বলছেন আপনারা ‘নাস্তিক’। এ বিষয়টিকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আমরা মোটেই নাস্তিকতা প্রচার করছি না। আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছি না, ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলছি। তারা যে ধর্ম ব্যবসায়ী সেটা পুরো জাতি জানে। তাদের কথায় কিছু আসে যায় না। এই মানুষদের সংখ্যা খুবই কম। সারা দেশে ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। আমরা দেখেছি ওরা কীভাবে পালিয়ে যায় নাকে খত দিয়ে। ২০১৩ সালের ৫ মে সেটা দেশবাসী দেখেছে। তাই ওদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওদের ভয়ে নিজেদের কাজ বন্ধ করব কেন! আমরা সবাই একত্রিত হলে ওরা ভয় পেয়ে পালাবে। তাই ওদের হুমকিধমকি নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।
দেশ রূপান্তর : আপনি নিজে কোনো হুমকির মুখে পড়েছেন কি?
শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : হুমকি বলতে বিভিন্ন সময়ে জীবনের প্রতি চ্যালেঞ্জ এসেছে। আমার মুন্ডু চাইছে তারা। এখন আমি বলতে চাই আমার মুন্ডুর বিনিময়ে যদি বাংলাদেশ মৌলবাদমুক্ত হয় তাহলেও আমি খুশি। হুমকি পেয়ে আসছি সেই যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দিনগুলো থেকে। আমি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার করেছি। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় দিয়েছি। তা কার্যকরও হয়েছে। তখনো আমি নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। তখনো নানারকম হুমকি দিয়েছে। কিন্তু আমি ভয় পাইনি। আমি যতদিন জীবিত থাকব মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমার লড়াই অব্যাহত থাকবে।