এই মুহূর্তে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সংকটময় পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করছেন সংগঠনের নেতারা। তারা বলেছেন, এখন দাম বাড়ালে পণ্যের মূল্যস্ফীতি ব্যাপকহারে বেড়ে যাবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যারা গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছে, তারা মূলত সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। মহামারীর মধ্যে শিল্পে উৎপাদন খরচ বহুগুণে বেড়েছে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমন সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ালে ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যাবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনের নেতারা এসব কথা বলেন।
শিল্প রক্ষায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে সিদ্ধান্তটি আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে নেওয়ার আহ্বান জানান ব্যবসায়ী সংগঠনের এই নেতারা। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম আগামী ২০ বছরে কোন সালে কত হারে বাড়ানো হবে, তার একটি আগাম পরিকল্পনা সরকারের কাছে চেয়েছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআইর সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বৈশ্বিক মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, উৎপাদন উপকরণসহ সব খাতে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের প্রায় সর্বত্র মূল্যস্ফীতির হার দুই সংখ্যার বেশি হওয়ার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত এবং আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘একদিকে আমাদের রপ্তানি শিল্পে উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং অন্যদিকে রপ্তানি খাতে বিশ্বব্যাপী চাহিদা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধিজনিত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা প্রকৃত অর্থে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্টে এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও পড়ছে। আবার সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের অর্থ প্রবাহে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।’
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কভিড পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজির ওপর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সমীচীন নয়। জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসার পরই বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা যেতে পারে। সরকার বিদ্যুৎ খাতের তহবিল থেকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কুইক রেন্টালের একসময় প্রয়োজন ছিল। এখন আর তার প্রয়োজনীয়তা নেই। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা উচিত। অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা উচিত। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। সরকার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের প্রস্তাবিত ট্যারিফ বৃদ্ধির আবেদনে দাম বাড়ানোর অর্থনৈতিক প্রভাব পূর্ণাঙ্গরূপে বিশ্লেষণ করা হয়নি। যে কারণে বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) আইন অনুযায়ী এই আবেদন ত্রুটিপূর্ণ। তাই এই আবেদন বিবেচনা করা উচিত নয়।’ সরবরাহ মূল্য বিদ্যমান হারে বজায় রেখে বাড়তি ব্যয় সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করার প্রস্তাব করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে আছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার, অনিয়ম, অপচয়, অবৈধ সংযোগসহ যাবতীয় অপব্যবস্থার নিরসন, অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ রিজার্ভ বিদ্যুতের সংস্থান করে উৎপাদন বন্ধ করে অহেতুক খরচ কমিয়ে আনা ও ক্যাপাসিটি চার্জ বাতিল করে অলস উৎপাদনকারীকে অর্থ পরিশোধ বন্ধ করা।
এ ছাড়া ভর্তুকিপ্রাপ্ত জ্বালানি খাতের ওপর শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রত্যাহার বা প্রয়োজনে ন্যূনতম শুল্ক আরোপ করা, সব খাতের জন্য গ্যাসের সাধারণ হার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এখন সঠিক সময় নয়। অন্তত ছয় মাস সময় নিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এখন দাম বাড়ালে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। দেশীয় শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে।
এফবিসিসিআইর পরিচালক ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ডলার সংকটের এই সময়ে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বেশি প্রয়োজন। এমন সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বেশিরভাগ টেক্সটাইল কারখানা মুখ থুবড়ে পড়বে, যা কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে।
এফবিসিসিআই পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‘সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতেই এই সংকটময় মুহূর্তে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মেদ হাতেম বলেন, ‘রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়লে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান প্রমুখ।