বিক্রির শীর্ষে ক্ষতিকর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ

দেশে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই যত্রতত্র ও অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ (প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই) সেবনের তথ্য উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) গবেষণায়।

এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপত্র ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের কারণে শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এসব রোগী নতুন করে কিডনি রোগ, গ্যাস্ট্রিক ও আলসার, স্মৃতিভ্রম, হাড় ফাটলসহ অন্তত ১০টি রোগে সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি শরীরে নানা ধরনের প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে দেশে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বিক্রি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। ২০১৭ সালে যেখানে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকার ওষুধ, সেখানে সর্বশেষ গত বছর বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ২০১৭ সালের তুলনায় গত বছর বিক্রি বেড়েছে ৭৯৮ কোটি টাকা।

এমনকি গত বছর দেশে যে পাঁচটি ওষুধ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ, ৩ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার। এরপর ডায়াবেটিসের ওষুধ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার, ভিটামিন ও মিনারাল ওষুধ ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকার এবং অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির (ফুসফুসের কিছু রোগকে বোঝায়, যার কারণে ফুসফুসে বায়ু চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যার সৃষ্টি হয়) ওষুধ ১ হাজার ৪৮২ কোটি টাকার।

গতকাল রবিবার বিএসএমএমইউর ‘এ’ ব্লকের মিলনায়তনে ‘ওভার ইউজ অব পিপিআই : আ রিভিউ অব ইমার্জিং কনসার্ন’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই হচ্ছে এমন ধরনের ওষুধ যার প্রধান কাজ হলো পাকস্থলীর প্যারাইটাল কোষ থেকে এসিড নিঃসরণ কমানো। বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ^বিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রাজীবুল আলম ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরবিন্দু কান্তি সিনহা।

সেমিনারে অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত সেবনের ফলে ৪৫ শতাংশ গ্যাস্ট্রিক আলসার হয়। এই অতিরিক্ত সেবনের কারণে শরীর থেকে ভিটামিন ও মিনারেলের (মাইক্রো নিউক্রিয়েন্ট) ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে দেহে নানা ধরনের ক্ষয় দেখা দেয়; বিশেষ করে শরীরে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, বিটামিন১২ ও আয়রনের ঘাটতি প্রকট হয়।’

উপাচার্য সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এসব রোগের ভয়ে হঠাৎ গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না। ক্রমে দুই সপ্তাহ, এক সপ্তাহ করে কমিয়ে দিতে হবে। দিনে একটি, দুই দিন পর আরেকটি করে ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। আমরা যদি শৃঙ্খলার সঙ্গে চলাফেরা করি তাতেও গ্যাস্ট্রিক হবে না। গ্যাস্ট্রিক না হলে ওষুধ খাওয়া লাগবে না। ওষুধ খাওয়া মানেই আরেকটি রোগ তৈরি করা। একটি রোগের জন্য ওষুধ খেলে আরেকটি রোগের সৃষ্টি হতে পারে।’

সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা দেখছি বাংলাদেশের মানুষ রাস্তাঘাটে পণ্যের মতো ওষুধ কিনে থাকে। অনেকে আবার ফার্মেসিতে গিয়ে দামি ওষুধ কিনে থাকেন। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে যে অবস্থায় রয়েছি তাতে দেশে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি লোক মারা যাবে। আমাদের অনেকে যখন-তখন স্টেরয়েড কিনে খাই। স্টেরয়েড খেয়ে মোটাতাজা হই। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ খারাপ।’

অধ্যাপক ডা. রাজীবুল আলম বলেন, ‘গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বড় অংশ বিক্রি হচ্ছে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া। রোগীর একটু পাতলা পায়খানা, মাথাব্যথা, পিঠে ব্যথাসহ নানা জটিলতা দেখা দিলে ফার্মেসির দোকানিরা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিচ্ছেন। অথচ এ ক্ষেত্রে একটু পানি পান করলে বা হালকা কিছু ওষুধ ব্যবহার করলে এ সমস্যার সমাধান করা যেত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপত্র ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের কারণে শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের কারণে গ্যাস্ট্রিক আলসার, স্মৃতিভ্রমের মতো ঘটনা ঘটতে পারে, এমনকি ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম কমে আসতে পারে।’

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘রোগীর প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই এ ধরনের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখতে হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অতিমাত্রায় এর ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। যত্রতত্র এবং অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ব্যবহার কমাতে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে।’

অধ্যাপক ডা. রাজীবুল আলম সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যখন ইচ্ছা তখন ওষুধ বিক্রি এবং কেনা সম্ভব নয়। একজন নাগরিক বছরে তিনবার গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ কিনতে পারবেন। কারণ ওখানে সবকিছু রেকর্ড থাকে আর এর বিল পরিশোধ করে কোনো বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশেও স্বাস্থ্যবীমা থাকলে ওষুধ বিক্রি ও কেনা এবং তদারকি করা সম্ভব হতো। তাহলে এই অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সবুজের সঞ্চালনায় প্রবন্ধের ওপর আরও আলোচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোশাররাফ হোসেন, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ হোসেন ও ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।