পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে যান। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেননি। তার গদি চলে যাওয়ার পেছনে এটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। তরুণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল কি পারবেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রতিপক্ষ চীন উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ক্ষমতা ধরে রাখতে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
বিলাওয়ালের যুক্তরাষ্ট্র সফর
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এপ্রিলের শেষের দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৭ মে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন তিনি। দুদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন দূর করতে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মন্ত্রীদের মধ্যে বিলাওয়ালই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর করলেন। নিউ ইয়র্কে তিন দিনের সফরের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বিলাওয়াল। বৈঠকে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। মূলত রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হওয়া খাদ্য সংকট ছিল দুদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার প্রধান বিষয়। বৈঠক শেষে টুইট বার্তায় বিলাওয়াল বলেন, ‘আমরা দুদেশের ৭৫ বছরের সম্পর্কের গুরুত্বের ওপর জোর দিই। আফগানিস্তানসহ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়। বৈঠকে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের বন্ধুত্ব আরও মজবুত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।’ বিলাওয়াল আরও জানান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কৃষি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই পক্ষ তাদের মতামত জানায়। প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা জারি রাখার বিষয়ে দুদেশ ঐকমত্যে পৌঁছায় বলেও জানান পাকিস্তানের ৩৩ বছর বয়সী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে বৈঠকের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাশাপাশি আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, রাশিয়া-ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থনের বিষয়ে আলোচনা হয় পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে।’ জাতিসংঘের সদর দপ্তরে খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈঠকে যোগ দিতে চলতি মাসের শুরুতে বিলাওয়ালকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ব্লিঙ্কেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণ ও তার পরিপ্রেক্ষিতে বিলাওয়ালের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক ধরনের শীতল সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। গত বছরের শুরুতে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি ইমরানের। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক রেখে দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুতের নীতি গ্রহণ করেছিলেন ইমরান। প্রধানমন্ত্রীর পদ হারানোর মধ্য দিয়ে তাকে এই ভুলের মাশুলও দিতে হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছেন, বাইডেন প্রশাসনই তাকে গদি থেকে সরানোর নেপথ্যে কাজ করেছে। বিলাওয়ালের যুক্তরাষ্ট্র সফর দুদেশের সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতিতে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা এখনই স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক
পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা বরাবরই হস্তক্ষেপ করে আসছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়ালের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) ডিরেক্টর জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আনজুম পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়ালের সফরের আগের সপ্তাহে ওয়াশিংটনে যান। সেখানে তিনি বিলাওয়ালের সফরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সালিভান ও দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ প্রধান উইলিয়াম জে বার্নসের সঙ্গে বৈঠক করেন। আইএসআই প্রধান নাদিম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল দুজনকেই মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেখা যায়নি। সে সময় পাকিস্তানের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ ও আইএসআই প্রধান ফয়েজ হামিদ যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তাদের শীতল অভ্যর্থনা জানিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন, কারণ তাদের সফরের আগে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান ‘দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে আফগানদের মুক্তি’ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। তার ওই মন্তব্যে ক্ষিপ্ত হয় ওয়াশিংটন।
ইমরানের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যে নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল, তা মেরামত করা দরকার ইসলামাবাদের। যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট না করলে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজের পক্ষেও ক্ষমতায় থাকা কঠিন। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান উভয় দেশের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ সম্পর্ক পাকিস্তান নষ্ট করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা গেলে তাৎক্ষণিক লাভ হবে পাকিস্তানের। দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তালেবানের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ হলে ফের তালেবানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে ইসলামাবাদ। এ ছাড়া বিপর্যস্ত অর্থনীতি সামাল দিতে পাকিস্তানের নতুন সরকারের পশ্চিমাদের ঋণ প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে চাইলেই পাকিস্তান এখন আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে না। এদিকে মিত্র দেশ চীনও পাকিস্তানকে আর ঋণ দিতে চাইছে না। পেইচিংয়ের আশঙ্কা, অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটে থাকা পাকিস্তানকে এখন ঋণ দিলে তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের জন্য পাকিস্তান সম্প্রতি ছয় বিলিয়ন ডলারের ঋণ চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় চীন।
গত বছরের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে তালেবানের হাতে দেশটির শাসন হস্তান্তরে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, শাহবাজের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের নতুন সরকার তাদের আবার আফগানিস্তান ও তার আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব খাটানোর সুযোগ এনে দেবে। জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগান শাখা আইএস-খোরাসান মার্কিন সেনা বিদায়ের পর আফগানিস্তানে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী তালেবানকে কখনো পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি পাকিস্তান। সম্প্রতি সেই নিয়ন্ত্রণ আরও কমে গেছে। অবশ্য ওয়াশিংটন এখনো বিশ্বাস করে, আফগানিস্তানের ওপর প্রভাব বিস্তারে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এখন ইউক্রেনের দিকে। এ সময় আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নিশ্চিত করবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
বিলাওয়ালের স্বার্থ
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর শুধু মার্কিন প্রশাসন নয়, আরও কয়েকটি পক্ষের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী আশা করছে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র বিলাওয়াল তার এ সফরের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের মনে ইতিবাচক ছাপ ফেলতে পারবে। আর বিলাওয়ালের জন্য এ সফর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মোক্ষম সুযোগ। আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বিলাওয়ালকে পিপিপির নেতৃত্ব দিতে হবে। নির্বাচনের আগে পিপিপির অনুগত কর্মী ও সমালোচক উভয়কে বিলাওয়ালের দেখাতে হবে, তার মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও নানা প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর মতো তিনিও সমান রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী। বিলাওয়াল এমন সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন যখন দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। এর জন্য পাকিস্তানের জনগণের একটি অংশ ইমরানকে দায়ী করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যেদিন ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দেন, সেদিনই মস্কো সফর করেন ইমরান, যা নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ইউরোপের কূটনীতিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পদক্ষেপের নিন্দা জানাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের অনীহায় ক্ষোভ প্রকাশ, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে মিলে বিকল্প ইসলামি জোট করার প্রস্তাব-ইমরানের এসব কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের বহুদিনের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক-বেসামরিক উভয়ের কর্র্তৃত্বের অধীনে বিলাওয়ালকে পুরনো ও নতুন বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে হবে।
চীন সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের চেষ্টারত পাকিস্তান অবশ্য বিপদের সময়ের বন্ধুদেশ চীনকে কোনো ভুল বার্তা দিতে রাজি নয়। এরই মধ্যে বিলাওয়াল অঙ্গীকার করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ইস্পাত কঠিন সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনই থাকবে; কাউকে এই অটুট সম্পর্ক ভাঙতে দেওয়া হবে না। গত ২৬ এপ্রিল করাচিতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় চীনের তিন নাগরিকের নিহত হওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন বিলাওয়াল। ওই ঘটনার এক দিন পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বোমা হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) করাচিতে চীনা ভাষার তিন শিক্ষক বহনকারী মিনিবাসে হামলার দায় স্বীকার করেছিল। পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে বিএলএ। সংগঠনটির ভাষ্য, স্থানীয়রা চীনা বিনিয়োগে লাভবান হবে না।
সম্প্রতি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আলাপে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পে ইসলামাবাদের অগ্রাধিকারের বিষয়ে জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প ও সংস্থায় কাজ করা চীনের নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ও পুনর্ব্যক্ত করেন শাহবাজ। এদিকে নিউ ইয়র্ক সফরের পরপরই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের আমন্ত্রণে গত রবিবার দেশটিতে দুদিনের সফর করেন বিলাওয়াল।
প্রশংসিত বিলাওয়াল
যুক্তরাষ্ট্র সফরে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান, আফগানিস্তান সংকট, কাশ্মীরে ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন বিলাওয়াল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠকে ওইসব বিষয়ে তিনি দেশের অবস্থান দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে ঘিরে বিলাওয়াল নিউ ইয়র্কে যে বক্তব্য দেন, তা সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলকে। ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশে মস্কো গিয়েছিলেন ইমরান খান। ওই দিন সকালেই ইউক্রেনে হামলা চালান রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। ইউক্রেনে হামলার দিনই মস্কো সফর ইমরানের অদূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে অভিহিত করে আসছেন বিশ্লেষকরা। তার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকে দেখা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ওই ঘটনা নিয়ে যেখানে ইমরানকে এখনো দেশে ও দেশের বাইরে কথা শুনতে হয়, সেখানে প্রতিপক্ষ শিবিরের কনিষ্ঠ রাজনীতিক বিলাওয়াল যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে তারই পক্ষ নিয়েছেন। এজন্য বিলাওয়ালের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেশ-বিদেশের রাজনীতিকরা।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক বিলাওয়ালকে প্রশ্ন করেছিলেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি মস্কো সফর করে ইমরান খান যে ভুল করেছিলেন, তা কীভাবে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার শুধরাবে। জবাবে পাকিস্তানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরানের মস্কো সফরের বিষয়ে আমি পুরোপুরি তার পক্ষ নেব। পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। ইমরান কোনোভাবেই জানতেন না ওই দিনই ইউক্রেনে হামলা হবে। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো ইমরানও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অধিকারী নন। আক্রমণের দিন আগে থেকে অনুমান করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ ধরনের নির্দোষ পদক্ষেপের জন্য পাকিস্তানকে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানে নেই। আমি ইমরানের রাজনীতির পক্ষ নিচ্ছি না। তার ইস্তাহার বা সরকারেরও সমর্থক নই। তবে ইমরানের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে রাশিয়া সফরের কথা উঠলে আমি বারবার একই কথা বলব। যেদিন তিনি মস্কোতে পা রাখেন, সেদিনই রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালায় এ বিষয়ে ইমরান একেবারেই অন্ধকারে ছিলেন।’ বিলাওয়ালের ওই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপায়। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইমরানের পক্ষ নিয়ে তরুণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্রও তার রাশিয়া সফর বিলাওয়ালের মতো এত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারেনি। বিলাওয়ালের এই শিষ্টাচার পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত করতে ভূমিকা রাখবে। ক্রিকেট থেকে রাজনীতির অঙ্গনে আসা ইমরানের অনুজ রাজনীতিকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে।
বিলাওয়ালের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কয়েক দিন আগে পাঞ্জাব রাজ্যের ফয়সালাবাদ শহরে এক সমাবেশে ইমরান বলেছিলেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনের কাছে ভিক্ষা চাইবেন বিলাওয়াল ভুট্টো। নিজের সব সম্পদ দেশের বাইরে গচ্ছিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি নাখোশ করতে চাইবেন না, নয়তো সব হারাবেন।’ ইমরানের শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য শোনার পরও কোনো প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেননি পিপিপির নেতা বিলাওয়াল। ক্ষমতা গ্রহণের পরের মাসেই বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সফর করেন তিনি। সুইজারল্যান্ডেও যাওয়ার কথা রয়েছে তার। চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য রেখে চলা ছাড়া উপায় নেই ইসলামাবাদের। আর পররাষ্ট্রনীতিতে বিলাওয়াল ভুট্টোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে পাকিস্তানের ভাগ্য।