মুশফিক-লিটনের বীরত্বে প্রত্যাবর্তনের রূপকথা

দিন শুরুর সঙ্গে ২৪/৫ দেখে যারা ভ্রুকুটি করেছেন। বিরক্তিতে খেলা না দেখে দিন শেষে স্কোরে চোখ দিয়েছেন তাদের ভ্রু কপাল ছুঁয়েছে নিশ্চিত। হ্যাঁ, দিনে আর কোনো উইকেট হারায়নি বাংলাদেশ। মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাশের দৃঢ়তায় ওই ৫ উইকেটেই ৮৫ ওভারে করেছে ২৭৭। মুখ ফিরিয়ে নেওয়াদের মিসের তালিকাটা লম্বা। সিঙ্গেল নিয়ে মুশফিকের নবম সেঞ্চুরি, বাতাসে ফিস্ট বাম্প, ছেলে বাঘ পছন্দ করে বলে বাঘের ভঙ্গি, এমআর ১৫ লেখা ব্যাট আড়াআড়ি ধরে পুরো স্টেডিয়ামের সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব। ওদিকে ওভার থ্রোতে চার পেয়ে লিটনের তৃতীয় সেঞ্চুরি, ক্লান্ত হাতে তার ব্যাট-হেলমেট তুলে ধরা, পেছন থেকে মুশফিকের দৌড়ে এসে অভিনন্দন দেওয়া। আর অবশ্যই দুই ব্যাটারের চোখ জুড়ানো শটের পসরা। সব মিলিয়ে ইতিহাস গড়া জুটিতে ফিরে আসার এক নতুন নাটক লিখে ভয়ে শুরু দিনটি অবশেষে বাংলাদেশের করে নিলেন মুশফিক ও লিটন। দিন শেষে দুজনই অপরাজিত, লিটন ১৩৫ ও মুশফিক ১১৫।

এ দুজনের জুটি অপরাজিত আছে ২৫৩ রানে। ষষ্ঠ উইকেটে এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ও একমাত্র ২০০ রানের যুগলবন্দি। ২০০৭ সালে পি সারা ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ষষ্ঠ উইকেটে ১৯১ রান মুশফিক-আশরাফুলের।

তৃতীয় সেরা ১৬৭ রানের জুটিতেও আছেন মুশফিক। জুনায়েদ সিদ্দিকীর সঙ্গে ২০১০ সালে চট্টগ্রামে। ২৫ বা তার কম রানে ৫ উইকেট হারানোর পর টেস্ট ইতিহাসের সেরা জুটি এটি। আগের সেরা ছিল ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের ওয়ালিস ম্যাথিয়াস ও সুজাউদ্দিনের। ঢাকায়, উইন্ডিজের বিপক্ষে দুজনে ৮৬ রান যোগ করেন।

অথচ এর আগে সকালটা কী হতাশাজনকই না ছিল। এদিন আইসিসি চেয়ারম্যান গ্রেগে বার্কলের ম্যাচ দেখতে আসার কথা। প্রথম সেশনের সূচি বদলে হলো দ্বিতীয় সেশন থেকে দিনের বাকিটা সময়। কিন্তু শুরুর আধাঘণ্টার ঝড়ে লন্ডভন্ড বাংলাদেশের ইনিংস। শঙ্কা জাগল আইসিসি চেয়ারম্যান এসে না শ্রীলঙ্কাকেই ব্যাট করতে দেখেন। এই ভয়ের কারণও ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় গত সিরিজেই তো দুটি ইনিংসে ৫৩ ও ৮০ আছে। উইকেটে যাওয়া শুরু হলে লাইন ধরেই তো ড্রেসিংরুমের পথ ধরেন বাংলাদেশ ব্যাটাররা। তাহলে কি আবারও ব্যাটিং ধসের বিভীষিকা! কিন্তু না, সূর্যের তাপে পিচের শুরুর ময়েশ্চারের সঙ্গে অশনি সংকেতও মিলিয়ে যেতে শুরু করে। দুর্বোধ্য মিরপুরের পিচ হয়ে ওঠে বোধগম্য। তাতে মুশফিক-লিটন মিলে খাদের কিনারা থেকে উঠে আসার গল্প লিখলেন। তাতে ছন্দপতন শুরু একবারই। ৪৭ রানে থাকা অবস্থায় পুল শট করতে গিয়ে মিস টাইমে বল হাওয়ায় তুলে দিয়েছিলেন। কামিন্দু মেন্ডিস ফাইন লেগের দিকে ওই ক্যাচ ছেড়ে লিটনকে বড় কিছু করার সুযোগ দেন। লঙ্কান কোচ ক্রিস সিলভারউডেরও এই ক্যাচ মিসের আক্ষেপ, ‘এটা আমাদের ব্যর্থতা যে সকালে যে শুরু পেয়েছি তা ধরে রাখতে পারিনি। আমরা সুযোগ তৈরি করেছিলাম কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারিনি। ধারাভাষ্যকার বলছিলেন যে এই সুযোগ মিস আমাদের বড় বিপদে ফেলবে। দিন শেষে তাই হলো। একজন ভালো ব্যাটারকে যদি আপনি সুযোগ দেন তবে সে তা কাজে লাগাবেই।’

দুহাতে ওই সুযোগ লুফে নিয়ে সবশেষ ১৩ ইনিংসে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি তুলে নিলেন লিটন। গত দেড় বছর ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন এই ব্যাটার। টেস্টে তো আরও উজ্জ্বল তিনি। এই ম্যাচের আগে এই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় ছিলেন ১০-এ। অপরাজিত ১৩৫ রানের ইনিংসে ৭২৪ রান নিয়ে এক লাফে উঠেছেন পাঁচে। আজ সকালে আরও কিছু রান করলে ঋষভ পান্তকে (৭৪৮) টপকে উইকেটকিপার হিসেবে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হয়ে যাবেন।

লিটনের কিছু পরেই ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার টানা টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন মুশফিক। এক সিরিজের দুই টেস্টে প্রথমবার অবশ্য। টানা টেস্টে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করা মিস্টার ডিপেন্ডেবল খেলেছেন আরেকটি নিখুঁত ইনিংস। এদিন সুইপ শটও তার ব্যাটে লাগছিল ঠিকঠাক। চট্টগ্রাম টেস্টের চেয়ে একটু দ্রুত সেঞ্চুরি পেয়েছেন এবার, ২১৮ বলে। ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরিতে দলকেও দেখাচ্ছেন সঠিক পথ। লিটনকে নিয়ে ২৫৩ রানের জুটিতে আরও একবার নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়ার প্রমাণ রাখলেন। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে চট্টগ্রামে ২০৬ রানের জুটি ছিল তাদের।

দিনের শুরুতে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে খেলা শুরু না হতেই দ্বিতীয় বলে আউট মাহমুদুল হাসান জয়। পাকিস্তানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে সবশেষ সিরিজে সামনে পা না নেওয়ার ভুল করে বোল্ড হন। কাসুন রাজিথার বলে ঠিক সেই পুনরাবৃত্তিতে আবারও ব্যর্থ তিনি। পরের ওভারে ফিরলেন তামিম। ৫ হাজারের মাইলফলক থেকে মাত্র ১৯ রান দূরে থাকা এ বাঁহাতি ক্রস ব্যাটে খেলতে গিয়েছিলেন অনসাইডে। বল ব্যাটের ওপরের কানায় লেগে পয়েন্টে ফিল্ডারের হাতে। টেস্টে এ নিয়ে তৃতীয়বার বাংলাদেশের দুই ওপেনার শূন্য রানে ফিরলেন। তিনটিতেই আছেন তামিম। দুই চারে রানে ফেরার ইঙ্গিত দেওয়া মুমিনুল থামলেন সেখানেই মাত্র ৯ রান করে আসিথার বলে ড্রাইভ না ব্লক এই দ্বিধায় থেকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। শান্ত রাজিথার ইনসুইং বলে ডিফেন্স খোলা রেখে ড্রাইভ করতে গিয়ে সরাসরি বোল্ড ৮ রানে। আর সাকিব পরের বলে রিভার্স সুইংয়ে পরাস্ত হয়ে এলবি। কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর ব্যাখ্যা, ‘আমাদের শুরুটা খুব বাজে ছিল। দুটি বল ছিল ভালো আর দুটি ভুল শট করেছি আমরা। অবশ্যই পিচকে দোষ দেব না। এই পিচ দারুণ, এখনো ভালো ব্যাট করা যাবে।’

এই পিচেই আজ ভালো কিছু আশা করছেন ডমিঙ্গো। এখনো মোসাদ্দেক আছেন বলে আশা বড় তার। ঠিক কত স্কোর চান এমনটা না বললেও দিনের শুরুর সেশনটা উইকেটহীন আশা করছেন কোচ, ‘আমরা এখনো ম্যাচে আছি। মুশফিক-লিটন কাল (আজ) যদি ৩০০ রান এনে দিতে পারে... এরপর মোসাদ্দেক আছে। আমরা ইতিমধ্যে এই উইকেটের গড় রানের কাছাকাছি আছি যা কিনা ৩১৪। আমি বেশি আশা করছি না কারণ মিরপুরের চরিত্র আমাদের সবার জানা।’

কোচ বেশি আশা না করলেও মুশফিক-লিটন আশা জাগাচ্ছেন। প্রথম সেশনে ৬৬ পরের সেশনে ১৫৩ রানের পর দিন শেষে ২৭৭, এবার প্রথম ইনিংসে ৩৫০ এর বেশি রান এলে মিরপুরের উইকেটে এগিয়ে থেকে লঙ্কানদের চাপে ফেলাও খুব সহজ।