বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (বিআইসিসি) বছর দশেক আগে ইজারা নেয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল)। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন এ স্থাপনাটির ইজারা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। ২০১২ সালে নেওয়া এই ইজারার ১০ বছরে বিএসএল’র কাছে গণপূর্তের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী এ টাকা দিতে অপারগতা জানিয়ে মওকুফের জন্য দেনদরবার চালানো হয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। অবশ্য বিএসএল’র ব্যর্থতার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাশিত সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ১০ বছর পর আবার বিআইসিসি পরিচালনার দায়িত্ব বিএসএল’র কাছ থেকে ফেরত পাচ্ছে গণপূর্ত। কিন্তু মাঝপথে বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থের কী হবে এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মনে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএসএল’র কাছ থেকে আমরা জুনের শেষের দিকেই বিআইসিসি বুঝে নেব। এমন সিদ্ধান্তই হয়েছে। এখন আমাদের যে টাকা বকেয়া রয়েছে তা আদায় করতে নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। যেহেতু দুটিই সরকারি প্রতিষ্ঠান, সেখানে অর্থ আদায়ে তো এর বেশি কিছু করা যাচ্ছে না।’
প্রধান প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তর আগে পরিচালনা করেছিল এটি (বিআইসিসি)। সেই সময় প্রতি বছর আমরা বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছি। বিএসএল লিজ নিয়ে বেশকিছু অর্থ লোকসানের কথা বলছে, এমনকি বকেয়া টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলেও জানায় তারা। এক পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথ পরিচালনার প্রস্তাবও দিয়েছে বিএসএল। কিন্তু তা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নাকচ হয়েছে। ফলে এখন আমরাই দক্ষ জনবল দিয়ে তা পরিচালনা করব।’
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের ৩০ মার্চ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব অভিজিৎ রায় বিএসএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘বিআইসিসি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালের ১৭ জুন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে বিএসএল’র ১০ বছর মেয়াদি লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আগামী ৩০ জুন সেই চুক্তির অবসান হবে। বর্ণিত অবস্থায় বিআইসিসি পরিচালনা বাবদ বিএসএল’র কাছে পাওনা বকেয়া ভাড়া ও সুদ অবিলম্বে পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’
কর্মকর্তারা আরও জানান, বিআইসিসি’র সার্বিক বিষয় তুলে ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘লিজ নেওয়ার পর থেকে প্রথম তিন বছর পুরোপুরি ও চর্তুথ বছর আংশিক ভাড়া পরিশোধ করে। এরপর থেকে বিএসএল কর্তৃপক্ষ আর কোনো টাকা পরিশোধ করেনি। এরপর থেকে বিএসএল’র সঙ্গে বিভিন্ন কমিটির সভায় বারবার তাগাদা দিলেও লোকসানের অজুহাতে কোনো টাকা পরিশোধ করছে না। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ জুলাই বিএসএল’র সঙ্গে সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হলে সেখানে সংস্থাটির প্রতিনিধি জানান, বকেয়া টাকা পরিশোধ করা সম্ভব না। শুধু তাই নয়, শর্ত অনুযায়ী পাঁচ তারকা মানের পরিচালনার কথা থাকলেও তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থাপত্য সৌন্দর্য রক্ষায়ও ব্যর্থ হয়েছে। ভবনের পেছনে ওয়াটার বডিতে অস্থায়ীভাবে প্যান্ডেল স্থাপন করে খাবার তৈরি করে অতিথিদের পরিবেশন করা হচ্ছে, যা চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও ভবনের বিদ্যমান কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর। ফলে স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে; চুক্তি অনুযায়ী যা বিএসএল’র করার কথা।’
সরকারি এ স্থাপনাটি বিএসএল দীর্ঘদিন পরিচালনা করে মোটা অঙ্কের লোকসান দিয়েছে উল্লেখ করে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সম্মেলন কেন্দ্রটি নিজেদের হাতে রাখতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল বিএসএল। এক পর্যায়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে সরকার প্রধানের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সবকিছু জেনে প্রধানমন্ত্রী বিএসএল’র প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গণপূর্তকেই দায়িত্ব দেন।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিএসএল’কে ইজারা দেওয়ার আগের বছরও গণপূর্ত অধিদপ্তর নিজস্ব জনবল দিয়ে বিআইসিসি পরিচালনা করে ২০১১/২০১২ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। তাই যৌথ নয়, এককভাবেই বিআইসিসি পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের কাছে ফিরিয়ে আনতে চাইছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া স্থাপনাটি পরিচালনায় গণপূর্তের আগের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই বিআইসিসি পরিচালনার জন্য বিএসএল’র কোনো প্রয়োজন পড়বে না। নিজেদের হাতে এনে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারলে গণপূর্ত অধিদপ্তর সেখান থেকে আয় করে সরকারের কোষাগারে দিতে পারবে।