রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূলধন বাড়াতে চায়। ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ও মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের তুলনায় মূলধন কম হওয়ায় নতুন করে মূলধন বৃদ্ধি করতে চায় ব্যাংকটি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অনুমোদন চেয়েছে কৃষি ব্যাংক।
সময়ের পরিক্রমায় ঋণ ও অগ্রিম স্থিতিসহ ব্যাংকের কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বহুমাত্রিক প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী কৃষি ব্যাংকের মূলধন ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
১৯৭২ সালে ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধন ও ১০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ও অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এমতাবস্থায় কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়িক কর্মকা- সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ়করণ, বৈদেশিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ, ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ এবং সার্বিক ভাবে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রম সুচারু ভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৭৮তম সভায় মূলধন ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি।
মূলধন বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইসমাইল হোসেন।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ব্যাংকের ভিত্তি শক্ত হওয়ার পাশাপাশি ঋণ-অগ্রিমও বেড়েছে, কার্যক্রম বেড়েছে, প্রসার লাভ করেছে। ভবিষ্যতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে সুচারু ভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মূলধন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদনের পরই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ১২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মুখ্য কার্যক্রম কৃষিঋণ বিতরণকেন্দ্রিক হওয়ার কথা থাকলেও অন্যান্য ব্যবসাও প্রসার করেছে। শিল্প খাতে বেশি ঋণ দেওয়ার কারণে কমেছে কৃষিঋণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকটির কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা।
মূলধন বৃদ্ধি করার যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন অনুযায়ী মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। উক্ত গাইডলাইন অনুযায়ী ২০২১ সালের ৩০ জুন আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ ২৩ হাজার ৬৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ১০ শতাংশের হিসাবে মূলধন প্রয়োজন ২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২০-২১ অর্থবছরে মূলধান ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ১৪০ দশমিক ১১ শতাংশ বা ৬ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বেড়েছে ১১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা বা ৮৩ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৯৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে এসে মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ১১ হাজার ৮৭১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
স্বাধীনতার পর দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) প্রতিষ্ঠা করলেও লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে ব্যাংকটি। অনিয়ম ও দুর্নীতি, সরকারের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, কৃষিঋণের সুদের হার কম ও তহবিল পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিশেষায়িত এই ব্যাংকটির অবস্থা খুব ভালো নয়। মূলধন ঘাটতি পূরণে ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৫০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২৫ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। মোট আমানতকারী ৯২ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৬ জন। ঋণগ্রহীতা ৩৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৮১ জন। সারা দেশে মোট শাখা রয়েছে ১ হাজার ৩৮টি।