সরকারি নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে কুষ্টিয়ায় গড়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চক্র। কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কে গড়াই নদীর ওপরের মীর মশাররফ হোসেন সেতু এবং এর কয়েক মিটারের মধ্যে থাকা দেশের প্রাচীনতম রেল সেতুর পাশ থেকে বালু তোলার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে সেতু দুটি। যা বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এর ৪ নম্বর ধারার ‘খ’ উপধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওই সেতু দুটি সংলগ্ন জায়গা থেকে খনন যন্ত্রের মাধ্যমে বালু কেটে প্রতিদিন শত শত ড্রাম ট্রাক ও ট্রলি ভর্তি করে চলে যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন জায়গায়। কুমারখালী উপজেলার জয়নাবাদ, রাহিনীপাড়া ও ছেউড়িয়া মৌজাভুক্ত এই বালুমহালটি সরকারিভাবে ইজারা না দেওয়া হলেও কথিত ইজারাদার সেজে বালি উত্তোলন করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এভাবে সেতুর কাছ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সেতু সংলগ্ন নদীর পাড় ভেঙে সেতু দুটি এর আগে একাধিকবার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। আর সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি সুরাহার জন্য তারা একাধিকবার জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন।
কথিত ইজারাদাররা বালুমহালটি ইজারা নিয়েছেন বলে দাবি করলেও জেলার রাজস্ব বিভাগ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের তথ্যমতে, জেলার ২১টি বালুমহালের মধ্যে উল্লিখিত জয়নাবাদ, রাহিনীপাড়া ও ছেউড়িয়া মৌজাভুক্ত ৭১ একর জমির বালুমহালটি চলতি অর্থবছরে কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। রেল ও সড়ক সেতু লাগোয়া এই বালুমহাল থেকে যারা বালু উত্তোলন করছেন তা অবৈধভাবেই করছেন।
বালুমহালটি থেকে উত্তোলন করা বালু পরিবহনের কাজ করেন ট্রলিচালক আমিরুল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন এখান থেকে ভেকু (এক্সাভেটর) দিয়ে সরাসরি ব্রিজের নিচ থেকে বালু তুলে শত শত ড্রাম ট্রাক ও ট্রলি ভরে দিচ্ছে। প্রতি ড্রাম ট্রাক থেকে ১ হাজার ৭শ এবং ছোট ট্রলিপ্রতি ২৫০ টাকা করে টোল নিচ্ছে ইজারাদারের লোক।’
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অবৈধ বালুমহালে গড়ে প্রতিদিন ১৫০টি ড্রাম ট্রাক থেকে ১৭০০ টাকা করে দিনে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, আর প্রতিদিন গড়ে ১০০টি ছোট ট্রলি থেকে ২৫০ টাকা করে দিনে ২৫ হাজার টাকা আদায় করছে কথিত ইজারাদারের লোকজন। এই হিসেবে বালুমহালটি থেকে প্রভাবশালীদের দিনে আয় হচ্ছে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় কমপক্ষে ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না একটি টাকাও।
বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে কথিত ইজারাদার এসএম রাশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বালুমহালের ইজারা নিয়েই সেতুর ভাটি থেকে আমরা বালু তুলছি। আমাদের যেখানে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে সেখান থেকেই বালু তুলছি। এতে সেতুর কিছু হবে না।’
তবে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিরুল ইসলাম বলেছেন, কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের মীর মশাররফ হোসেন সেতু সংলগ্ন নদীর মধ্য থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সেতুটি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জানিয়ে প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আমি নিজে সরেজমিনে গিয়ে দেখে এসেছি সেখানে অন্তত ডজনখানেক এক্সাভেটর এবং বেলোটার (মাটিকাটা যন্ত্র) ব্যবহার করে ট্রাক ভর্তি করে দেওয়া হচ্ছে। যতদূর শুনেছি সাংবাদিক রাশেদ সাহেবরা ওখান থেকে বালু উত্তোলন করছেন। আইন না মেনে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে এই বালু উত্তোলনের ফলে শতকোটি টাকার সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ অঞ্চলের সমগ্র যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়বে। এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে শেখ রাসেল হরিপুর কুষ্টিয়া সংযোগ সেতু চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।’
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার মোট ২১টি বালুমহাল আছে ইজারাযোগ্য। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে সবগুলো ইজারা দেওয়া হয়নি। যেগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং যারা ইজারা নিয়েছেন তাদের আইনগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর বিধি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের মশাররফ হোসেন সড়ক সেতুটি জয়নাবাদ, রাহিনীপাড়া ও ছেউড়িয়া মৌজাভুক্ত ৭১ একর জমির বালুমহালের মধ্যে স্থাপিত। প্রথম কথা হলো এই বালুমহালটি চলতি অর্থবছরে ইজারা দেওয়া হয়নি। সেই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী নদীর উপরিস্থ সড়ক বা রেল সেতু যেখানে আছে সেখানে উজান এবং ভাটির এক হাজার মিটার বা ১ কিমি দূরত্বের মধ্যে কোনোভাবেই বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। কেউ এই আইন ভেঙে বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সাইদুল ইসলামের দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে গতকাল মঙ্গলবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার মোবাইল ফোনে কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া দেননি।