(প্রথম কিস্তির পর)
প্রায় একই সময়ে হুমায়ুন কবিরও দেখি প্রায় একই মত প্রচার করিতেছিলেন। ইঁহার মতানুসারে, নজরুল ইসলাম ছিলেনশেষ বিচারেঅসহযোগ আন্দোলনের কবি। তাঁহার প্রতিষ্ঠার সহিত অসহযোগ আন্দোলনের যোগাযোগটা প্রায় প্রত্যক্ষ। হুমায়ুন কবির লিখিতেছেন : ‘তবু রবীন্দ্রনাথ অসহযোগ আন্দোলনের কবি নন, এবং কেন নন তারও কারণ আমরা অন্যত্র আলোচনা করেছি। অসহযোগ আন্দোলনের আলোড়ন বাঙলা কাব্যে বোধ হয় নজরুল ইসলামের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জেগেছিল, এবং সেইজন্যই বর্তমান শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তাঁর এত প্রতিষ্ঠা। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রসঙ্গেও ব্যক্তিগত প্রতিভার বিচার অবান্তর, কারণ প্রতিভা সকল ক্ষেত্রেই অলৌকিক হলেও সামাজিক প্রতিবেশেই তার প্রকাশ। তাই সাহিত্যবিচারে একমাত্র সামাজিক পশ্চাদপট নিয়েই আলোচনা চলতে পারে’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯)।
নজরুল ইসলামের কাব্য-সাধনায় সিদ্ধি কি অসিদ্ধি হুমায়ুন কবিরের প্রধান বিবেচ্য ছিল না। তাঁহার বিবেচনায় ছিল সমাজ জীবনের ঐক্য কিংবা অনৈক্য। সেকালের সমাজ-জীবনের অনৈক্যের মধ্যেই তিনি যেমন রবীন্দ্রনাথের অসারতা দেখিয়াছেন তেমনি একই সমাজ-জীবনের ঐক্যের মধ্যেই খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন নজরুল ইসলামের সারমর্ম। তাঁহার ব্যাখ্যা ষোল আনা অভিনব না হইলেও আমাদের অব্যয় বিবেচনার যোগ্য। সেই কারণেই এখানে একটু চওড়া উদ্ধৃতির আশ্রয় লইতে হইতেছে। হুমায়ুন কবির লিখিতেছিলেন, ‘অসহযোগ আন্দোলনের যুগে ভারতবর্ষের জীবনধারায় যে বিপুল আলোড়ন, জাতির প্রায় সমস্ত স্তরকেই তা স্পর্শ করেছিল। মহাত্মা গান্ধীর মন্ত্রবলে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ যেন আসন্ন হয়ে উঠল, দিকে দিকে তার চাঞ্চল্য নির্জীবকেও চঞ্চল করে তুলল। বাঙলাদেশে কিন্তু এ জাগরণের যুগে স্বদেশী যুগের মতন সমৃদ্ধ সাহিত্য না দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগেতার কারণ কি’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯)?
নিজের প্রশ্নের উত্তর সমাজ গড়নের বিশ্লেষণযোগে তিনি নিজেই খুঁজিয়া লইয়াছিলেন। আরও খোলাসা করিয়া বলিলে, সমাজের অধিপতি শ্রেণীর (তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর) শ্রেণীচরিত্র এবং তাহার মানস গড়নে। হুমায়ুন কবিরের বিশ্লেষণ খানিকটা প্রণিধান করা যাইতে পারে। তিনি লিখিতেছেন, ‘হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীমানস উনিশ শতকে নিজেকে বিকশিত করেছিল। বিংশ শতকের গোড়ায় পৃথিবীর সর্বত্র মধ্যবিত্তশ্রেণীর বিকাশের সম্ভাবনা যখন ফুরিয়ে এলো, তখন বাঙলাদেশের অপেক্ষাকৃত পরিণত হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীর মধ্যেই তার প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। বঙ্গ-ভঙ্গরোধ উপলক্ষ হলেও স্বাধীন স্বাজাতিক রাষ্ট্র স্থাপনই ছিল স্বদেশী আন্দোলনেরপ্রকৃত এবং ব্যাপক লক্ষ্য। উপলক্ষ সাধিত হলো কিন্তু লক্ষ্য পূর্ব্বের মতনই দূরপরাহত হয়ে রইল বলে স্বদেশী আন্দোলনের ব্যাপক পরাজয়ে এই শ্রেণী তার আত্মবিশ্বাসও অনেকখানি হারিয়েছিল। তাই অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান যখন এল, তখন গণশক্তির প্রচন্ড আলোড়নে তার শ্রেণী-মানস স্ববিরোধী দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়ল’ (কবির ১৩৬৫: ৮৯-৯০)।
অখিল ভারতের সাধারণ পরিস্থিতির সহিত হুমায়ুন কবির পরাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশেষ গড়নের দিকেও দৃষ্টিপাত করিলেন। সেই দৃষ্টির মধ্যে তিনি যুগপদ ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা করিলেন স্বদেশী আন্দোলনের কবি রবীন্দ্রনাথ কেন অধিকক্ষণ অসহযোগ আন্দোলনের কবি রহিলেন না, আর নজরুল ইসলামই বা কী করিয়া ঐ আন্দোলনের কবি হইয়া উঠিলেন। হুমায়ুন কবির উবাচ : ‘পূর্ব্বেই আমরা দেখেছি যে চাকুরী ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাঙলায় মধ্যবিত্তশ্রেণীর অস্বাভাবিক স্ফীতি ঘটেছিল। তার ফলে বাঙলার হিন্দু জনসাধারণের দু কোটি আড়াই কোটি লোকের মধ্যে প্রায় সত্তর আশি লক্ষ মধ্যবিত্তশ্রেণী-সম্ভ্রমের দাবি রাখে। এটাও লক্ষণীয় যে পশ্চিমে যেমন ব্রাহ্মণের মধ্যেও ভুঁইহারী শ্রেণীর পরিচয় মেলে, বাঙলাদেশে তার কোন নমুনা নেই। এখানে আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, বর্ণহিন্দু মাত্রই মধ্যবিত্তশ্রেণীভুক্ত। শিক্ষার বিভ্রাটে হিন্দু সমাজের এ অন্তর্বিভাগ আরও বিস্তৃত হয়েছে, তার প্রতি ইঙ্গিতও আমরা করেছি। বাঙলায় যে গত পনেরো ষোল বৎসর রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং কর্ম্মপন্থার নানা সংকট, তারও কারণ হয়তো সামাজিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই মেলে। সাহিত্যিক ব্যাপারেও তার প্রভাব সুস্পষ্ট এবং সেইজন্যই অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙলাদেশে সবল ও সমৃদ্ধ সাহিত্য গড়ে ওঠেনি’ (কবির ১৩৬৫: ৯০-৯১)।
কাজী আবদুল ওদুদের মতন হুমায়ুন কবিরও দেখি শেষ পর্যন্ত স্থির করিয়াছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা কালের ধোপে টিকিবে না। পার্থক্যের মধ্যে তিনি নজরুল ইসলামের সহিত ‘জসীম উদ্দীনের’ নামটিও জড়াইয়াছিলেন। হুমায়ুন কবিরের বিচার মোতাবেক, ‘পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই’ নজরুল ইসলামের প্রতিভার পরিচয় মিলিবে, নতুন কোন দিকদেশ রচনার সাধ্য উঁহার হয় নাই।’ তাঁহার জবানবন্দি অনুসারে, ‘মুসলমান মধ্যবিত্ত-শ্রেণী সে সময়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সেইজন্য আশাবাদী, তার সামাজিক সত্তাও নানা কারণে দ্বিধাবিভক্ত হয়নি। সমাজ-জীবনের এই ঐক্যে নজরুল ইসলামের প্রতিশ্রুতির মূল প্রতিষ্ঠিত, এবং সেইজন্যই দেখি যে নিপীড়িত জনমানসের আশা-আকাক্সক্ষাকে রূপ দেওয়ার সাধনা তাঁর রচনায় সবল কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল’ (কবির ১৩৬৫: ৯১)।
হুমায়ুন কবিরের দোসরা প্রস্তাবটি ছিল এই রকম : ‘ঐতিহ্যের লঙ্ঘন তিনি করেননি পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত বলে বাঙলার বিপুল কৃষক-সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর সহজ আত্মীয়তা। ভাষা ও ভঙ্গিতে নজরুল ইসলামের কাব্যে যে বিপ্লবধর্ম্ম, পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই তার পরিচয় মেলে। দেশের গণ-মানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাব্যে [তিনি] যতটুকু রূপান্তরিত করতে পেরেছেন, জসীম উদ্দীনের কাব্য-সাধনায়ও ঠিক ততখানিই [সিদ্ধি]। উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চাদমুখী বলে সে শক্তি কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারেনি। মানস-সংগঠনে রূপান্তর হয়নি বলে দুজনের বেলায়ই সৃজনী-প্রতিভা অল্পদিনেই নিঃশেষ হয়ে এলো। আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ’ (কবির ১৩৬৫: ৯১)।
হুমায়ুন কবির জানিতেন, নজরুল ইসলামের কিংবা জসীম উদ্দীনের এই অনর্থ শুদ্ধ তাঁহাদের একেলার অনর্থ ছিল না। কথাটা তিনি আগেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন, ‘...সাহিত্যবিচারে একমাত্র সামাজিক পশ্চাদপট নিয়েই আলোচনা চলতে পারে।’ এই পদ্ধতি অনুসারে তাঁহার সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হওয়াই অনিবার্য ছিল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘কালধর্ম্মে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং সেই জন্য বর্ত্তমান সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে মুসলমানসমাজে মহৎ কবির আবির্ভাবের সম্ভাবনাও অত্যন্ত অল্প। যে প্রতিভার শক্তি এই সংকীর্ণ পশ্চাদপটের সম্প্রসারণ ও রূপান্তর আনতে পারে, বর্ত্তমানে তার সমস্ত উদ্যম সমাজ-সংগঠনের কাজেই বোধ হয় ব্যয় হয়ে যায়, সাহিত্যসৃষ্টির জন্য আর কিছু বাকী থাকে না। সেই জন্যই সাম্প্রতিক বাঙালী মুসলমান কবিদের মধ্যেই প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাঁদের নেই; সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনাবিমুখ’ (কবির ১৩৬৫: ৯১-৯২)।
শুদ্ধ কাজী আবদুল ওদুদ কিংবা হুমায়ুন কবির নহেন, আরও অনেকেই এই সত্যে সন্দেহ রাখেন যে নজরুল ইসলামের সঙ্গেই আধুনিক বাংলা কবিতার জন্ম। তাঁহারা নিশ্চয়ই জানেন গত শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি নজরুল ইসলাম নিচের কবিতাটি লিখিয়াছিলেন, কিন্তু এই কবিতার অর্থ কী তাহা তাহারা জানেন বলিয়া আজও মনে হয় না। তাঁহাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করি জার্মান তত্ত্বজ্ঞানী বাহ্লটার বেনিয়ামিন রচিত ‘পুনর্জননী কলাকৌশলের যুগে শিল্পকলা’ নামক প্রবন্ধটি পড়িবেন। এই প্রবন্ধের সার প্রস্তাব অনুসারে মহিমার অবসানেই মাত্র আধুনিকতার জন্ম।
মহিমার চারিটি অঙ্গ বেনিয়ামিন নির্দেশ করিয়াছিলেন: এইগুলির অপর নামযথাক্রমে ১. সৃজনশীলতা, ২. প্রতিভা, ৩. চিরকালের মর্যাদা এবং ৪. বোধাতীতের হাতছানি। বেনিয়ামিনের মাত্র এক দশক আগেই নজরুল ইসলাম এই সত্যে সহজ ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তাহাতে কি সন্দেহ আছে (বেনিয়ামিন ২০০৮, ইসলাম ১৯৬৭)!
কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতাই প্রমাণ করে কবিতায় মহিমার অবসান ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার তত্ত্বগত প্রতিষ্ঠা তাঁহার হাতেই সম্পন্ন হইয়াছিল। (সমাপ্ত)
দোহাই
১. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ (কলিকাতা: চতুরঙ্গ, ১৩৬৫)।
২. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আমার কৈফিয়ৎ’, নজরুল রচনাবলী, ২য় খ-, আবদুল কাদির সম্পাদিত (ঢাকা: কেন্দ্রীয় বাঙ্লা-উন্নয়ন-বোর্ড, ১৯৬৭), পৃ. ৪১-৪৪।
3. Walter Benjamin, The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility, and Other Writings on Media, ed. Michael W. Jennings et al., trans. Edmund Jephcott et al. (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2008)
লেখক অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, বাংলাদেশ
salimullah.khan@ulab.edu.bd