আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় আলোচিত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ও তার পাঁচ সহযোগীকে ৭ জুন পর্যন্ত কারা হেফাজতে রাখার নির্দেশে দিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালত। দুই দফায় ১৩ দিন রিমান্ড শেষে তাকে গতকাল শুক্রবার কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতের স্পেশাল সিবিআই-১-এ হাজির করে ভারতের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
একই দিন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেই তার বিচার হবে।
পি কে হালদার ও তার পাঁচ সহযোগীকে ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগর থেকে গ্রেপ্তার করে ইডি। পি কে হালদার সেখানে শিবশংকর পরিচয়ে ভারতের নাগরিক হিসেবে বসবাস করছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তার অন্তত ২২টি বাড়ি, মাছের খামারসহ বিপুল সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে।
পি কে হালদারের পাঁচ সহযোগী হলেন প্রাণেশ হালদার, স্বপন মৈত্র ওরফে স্বপন মিস্ত্রি, উত্তম মৈত্র ওরফে উত্তম মিস্ত্রি, ইমাম হোসেন ওরফে ইমন হালদার, আমানা সুলতানা ওরফে শর্মী হালদার।
প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে ১৭ মে পি কে হালদার ছাড়াও তার পাঁচ সহযোগীকে আদালতে তোলা হয়েছিল। তখন আরও ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
দেশের দুটি টিভি মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের আদালতে হাজির করে ইডি ১৪ দিনের কারা হেফাজতের আবেদন জানানোর কথা।
এরপর থেকেই তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পি কে হালদারের অনেক সম্পদের সন্ধান পায় ইডি। পি কে হালদারকে কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি সাহায্য করেছিলেন কি না, সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে ভারতের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে এমন ৪০ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী। এ ছাড়া কয়েকজন জমির দালাল এবং ব্যাংক কর্মকর্তাও রয়েছেন। ইতিমধ্যে দুটি বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছেন গোয়েন্দারা। ওই দুটি ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেনের সন্ধান পেয়েছেন তারা।
এখন পর্যন্ত পি কে হালদারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ভারতের অর্থ পাচার আইনের ৩ ও ৪ ধারায় একটিমাত্র মূল মামলা করেছে ইডি।
সূত্র বলছে, ইডির তদন্তপ্রক্রিয়া শেষ হলেই এই মামলার তদন্ত ভার দেওয়া হতে পারে ভারতের আরেকটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে। যেখানে অভিযুক্তদের অবৈধ দ্বৈত নাগরিকত্ব, অবৈধ ভারতীয় নথি, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অবৈধ অর্থ লগ্নিসংক্রান্ত একাধিক ধারায় মামলা হতে পারে।
ইডি সূত্রের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বললেও সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যক্তির নাম আসছে ঘুরেফিরে।
নাম না জানানোর শর্তে ইডির এক তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, শর্মী হালদারের কাছ থেকে মিলেছে অনেক তথ্য। তারা বলছেন, তুরুপের তাস হতে পারেন শর্মী। শর্মীর সঠিক পরিচয় নিয়ে এখনো কৌতূহল নানা মহলে। প্রথমে পি কে হালদারের ভাই প্রাণেশ (প্রীতিশ) হালদারের স্ত্রী বলে তার পরিচয় জানা গেলেও পরবর্তীকালে তার পরিচয় নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা।
আমাদের মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে জেলার পাঁচখোলা এলাকায় দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান কলেজে দুর্নীতিবিরোধী আন্তঃকলেজ মডেল বিতর্ক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
দুদক কমিশনার বলেন, ‘পি কে হালদার যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক, দেশের অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত, অর্থ পাচার কর্মকা-ের মহানায়ক, তাই বাংলাদেশে তার বিচার হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে পি কে হালদার ও তার কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলাও আছে। পি কে হালদারের সহযোগীরা অর্থ পাচারের বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তাকে দেশে এনে আদালতের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে আরও অজানা তথ্য বের হয়ে আসবে। এসব তথ্য মামলা নিষ্পত্তি করতে সহায়তা করবে।’