দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম, প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি খাসজমি গ্রাস, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্লট বরাদ্দ, জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দখল এমন সব ঘটনা অহরহই ঘটছে। ভূমি বা জমিজমা নিয়ে মানুষকে যে কতরকম ভোগান্তি পোহাতে হয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এক ব্যক্তির জমি অন্যের নামে নামজারি করা, উত্তরাধিকার সম্পত্তির নামজারিতে জটিলতা, বেঁধে দেওয়া সময়ে নামজারি সম্পন্ন না হওয়া, ভূমি জরিপের ক্ষেত্রে নানারকম নয়-ছয় করা ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা। একই সঙ্গে ভূমি অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালের যোগসাজশে নানা দুর্নীতি, ঘুষ ও আর্থিক কেলেঙ্কারি তো আছেই। সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ভূমির মালিকানা অর্জনের চেয়ে ভূমিরক্ষা করাটাই যেন কঠিন।
ভূমিরক্ষা করা যে কঠিন তার সবশেষ নমুনা দেখা গেল কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়ার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন ও পানি পরীক্ষাগার দখল করে টিনের ঘেরাও দিয়েছে প্রভাবশালী ভূমি দখলবাজ চক্র। আর এই দখলপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়াত এক নিঃসন্তান নারীর ওয়ারিশ সেজে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দখল করা ৮৭ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্যনির্মিত পানি পরীক্ষাগারসহ ওই জমিতে রয়েছে আরও কমপক্ষে ৩ কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো। আইনের ফাঁক গলিয়ে ভূমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি এই স্থাপনার দখল নিয়েছে দখলবাজ চক্র। এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ৫০ বছর আগে মারা যাওয়া এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশ সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে এই জমির দখল নেওয়া হয়েছে। ওই নারীর কথিত ওয়ারিশান সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাসকে সামনে রেখে স্থানীয় দখলবাজরা সরকারি সম্পত্তি অবরুদ্ধ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উল্লিখিত তফসিলভুক্ত জমির চৌহদ্দির মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো। ভূ-সম্পত্তি বা অবকাঠামো থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্য দিবালোকে জালিয়াত চক্র সন্ত্রাসী কায়দায় সরকারি অবকাঠামো ভেঙেচুরে টিনের বেড়া দিয়ে চারদিকে বাউন্ডারি করে যেভাবে অবরুদ্ধ করেছে তাতে এই প্রশ্ন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক যে, সরকারি সম্পত্তির দখলবাজরা কতটা শক্তিশালী? পাশাপাশি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে জমির মালিকানা নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বিরাজমান পরিস্থিতি রয়েছে, সেদিকেও ইঙ্গিত করেছে।
ভূমি জরিপ ও ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে দেশের নানা অপ্রীতিকর ঘটনা বোঝা যাবে দেশে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বিবেচনা করলেই। সাধারণ দেওয়ানি আদালতে ভূমি-বিরোধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। আর সারা দেশের ৪১টি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে অন্তত ৩ লাখ ৫ হাজার মামলা এখনো বিচারাধীন। ভূমি-বিরোধ সূত্রপাতের সাধারণ উৎস হলো ভূমি জরিপের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও জালিয়াতি। ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্রিটিশ আমলের ‘সিএস’ (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) এবং পাকিস্তান আমলের ‘আরএস’ (রিভিশনাল সার্ভে) জরিপই দীর্ঘদিন পর্যন্ত ছিল প্রামাণ্য দলিল। স্বাধীনতার প্রায় দেড় দশক পর প্রথমবারের মতো ১৯৮৪ সালে দেশে ‘বিএসআর’ (বাংলাদেশ সার্ভে-রিভাইজড) জরিপ শুরু হয়। তবে সারা দেশে এখনো শেষ হয়নি এই জরিপ। বরং যেসব এলাকায় শেষ হয়েছে সেসব এলাকায় নানা ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে মাঠ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও উদাসীনতায়। এই জরিপের পর্চা আর নকশায় ব্যাপক ভুল আছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার সম্প্রতি ভূমি জরিপ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আনতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করে বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত করে ‘স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট-১৯৫০’ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। সংশোধিত নতুন আইনের নাম হবে ‘স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (সংশোধন) ২০১৯’। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে সারা দেশে ১২টি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আইন মন্ত্রণালয়। ২০১২ সালে তা বাড়িয়ে ৪১টি করা হয়। ৪১টি জেলায় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করার পর বাকি ২৩টি জেলাকে ভাগ করে সেগুলো গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর সঙ্গে একীভূত করা হয়। কিন্তু মূলত বিচারকের স্বল্পতা এবং একটিও আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় তিন লাখেরও বেশি মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি না হলে আপিল করতে হয় হাইকোর্ট বিভাগে। কিন্তু ২০০৪ সালের আইনেই সারা দেশে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকলেও বিস্ময়কর বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্র আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেনি। ফলে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো বিগত ১৫ বছর ধরে শুধু পদ্ধতিগত কারণেই অমীমাংসিত থেকে গেছে। আর এসব অমীমাংসিত ঘটনার সুযোগেই সমাজের দুষ্টচক্র সরকারি জমি থেকে শুরু করে ব্যক্তির সম্পত্তিও দখল করে চলেছে। যথাযথ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ ছাড়া এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে বলে মনে হয় না।