বিশ্বব্যাংকেই চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন মসিউর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেছেন, পদ্মা সেতু ইস্যুতে তাকে দায়িত্ব ও দেশত্যাগের শর্তে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গত শুক্রবার রাতে আওয়ামী লীগের ওয়েবিনারে পদ্মা সেতু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ কথা জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক আয়োজন ‘রাজনীতির সাতকাহন’ শীর্ষক ওয়েবিনারের পঞ্চম পর্বে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ড. মসিউর রহমান বিশ্বব্যাংক কীভাবে তখন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছিল, সে সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘কেবল ইসলামি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বাদে অন্য যারা এখানে অর্থায়ন করেছে; বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং জাইকা এরা একদিন সকালে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইল। তারা বলল, জাপানি অ্যাম্বাসি অফিসে সাক্ষাতের কথা। আমি বললাম, সেখানে আমি যাব না। এর পেছনে আমার যুক্তি ছিল, আমি যদি সেখানে যাই তাহলে মানুষের ধারণা হবে বা প্রচার হবে, আমি তাদের কাছে নত হয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাচ্ছি।’

ড. মসিউর রহমান আরও বলেন, ‘তাই আমি বললাম যে তোমরা আমাদের এখানে আসো।’ জাপানি অ্যাম্বাসেডর বলল, ‘তোমার ওখানে গেলে জার্নালিস্টদের ফেস করতে হবে।’ আমি বললাম, ‘জার্নালিস্টদের আমি ফেস করব। তখন ওরা আসল। এসে আমাকে বলল যে আমাকে দায়িত্ব ত্যাগ করতে হবে, দেশও ত্যাগ করতে হবে। দেশত্যাগের শর্ত হলো তারা আমাকে বিদেশে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে বা অন্য কোথাও একটা কনসালটেন্সি জোগাড় করে দেবে। আমি যে বেতন চাই তাই ব্যবস্থা করে দেবে তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কিছু কাজ ঠিক করে দেবে, এমন প্রস্তাবও দেয়। এর পেছনে তাদের বুদ্ধি ছিল, আমি যে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি উত্তর দিই, দেখো আমার যদি টাকা করার ইচ্ছা থাকত তাহলে এখানেই তো টাকা করতে পারতাম।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, ‘যে দোষ করেছে তাকে আবার পুরস্কৃত করবে, কেন? এটা সামঞ্জস্যহীন। তার আগে একটু বলি, বিশ্বব্যাংক অভিযোগ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও কিছু গুরুজন স্থানীয় প্রভাবশালী, দুয়েকজন আমার বন্ধু, তারাও আওযামী লীগের সঙ্গে যুক্ত, বন্ধু হিসেবে তারা আমাকে বলেছে যে তোমার নামে এসব ছড়াচ্ছে তুমি কেন দায়িত্ব ত্যাগ করো না এবং দেশ ছাড়ো না। আমি বললাম যে দেখো আমি দেশের বাইরে গেলে আমার পায়ের তলায় মাটি থাকবে না। আমার ক্ষমতা তত দিন যত সময় আমি দেশের মধ্যে আছি। আরেকটি হলো প্রধানমন্ত্রী আমাকে সাহস জুুগিয়েছেন।’ এই বলেই কেঁদে ফেলেন ড. মসিউর।

ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা যখন গ্রহণ করা হয়, তখন বিশ^ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এই দুই সংস্থাই এ প্রস্তাবে অনীহা প্রকাশ করে। এরপরই জাপানের কাছে বিনিয়োগ আহ্বান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাপান সরকারের কাছে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ আহ্বান করা হলে তারা যেকোনো একটি সম্পর্কে বলে। আর তখনই প্রধানমন্ত্রী দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কথা ভেবে পদ্মা সেতুকে বেছে নেন। এর পরই বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক শুরু থেকেই প্রকল্পে দুর্নীতি হচ্ছে, এমন নানা ধরনের নালিশ করতে থাকে। পদ্মা সেতু নামে ই-মেইল আইডি খুলে নানাজনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা, যেসব বেশিরভাগই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুরুচিপূর্ণ। এমনকি একজন নারী কর্মকর্তার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টিকেও তারা সামনে নিয়ে আসে। এগুলো ছিল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।’ পরে কানাডার আদালত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পায়নি বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি না থাকলে পদ্মা সেতু সম্ভব হতো না উল্লেখ করে তার এই উপদেষ্টা বলেন, ‘পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্য গর্ব ও অহংকারের বিষয়। শেখ হাসিনার দূরদর্শী দৃষ্টির কারণেই আজ জাতি ইতিহাস সৃষ্টির দ্বারপ্রান্তে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আমাদের জন্য আনন্দের এবং অহংকারের বিষয়। পদ্মা সেতু পদ্মাপাড়ের মানুষের মাঝে উন্নয়নের স্পৃহা তৈরি করেছে। আর এই স্পৃহার উৎস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

পদ্মা সেতুবিরোধীদের প্রসঙ্গে ড. মসিউর রহমান বলেন, ‘যারা পদ্মা সেতুর কোনো উপযোগিতা দেখতে পাচ্ছেন না, তাদের চোখে আসলে ছানি পড়েছে। যারা সমৃদ্ধির আলো দেখতে পায়, তারাই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। এতে আরও আলোচনা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। এ আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করে দলের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেইসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এ অনুষ্ঠান।