দেশে লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযান আরও কিছুদিন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার শেষ হওয়া ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটামের মধ্যে যারা অবৈধ প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় বন্ধ করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আলটিমেটাম অনুযায়ী সারা দেশে বন্ধ হওয়া অবৈধ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের তালিকা সমন্বয় করা হচ্ছে। এরপর দুই-তিন দিনের মধ্যেই এলাকাভিত্তিক বৈধ ও স্বেচ্ছায় বন্ধ হওয়া অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তালিকা ধরে সারা দেশে অভিযান চালানো হবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর গতকাল রবিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অবৈধ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার জন্য আমরা ৭২ ঘণ্টার যে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, সেটা খুবই কার্যকর হচ্ছে। সেজন্য আমরা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ আলটিমেটাম চলবে। অন্তত আরও দুই-তিন তো চলবেই। তখন সারা দেশে বন্ধের একটা তালিকা তৈরি হবে। সেটা ধরে মাঠে আরও কী পরিমাণ অবৈধ প্রতিষ্ঠান আছে বোঝা যাবে। পরে সেই তালিকা ধরে আমরা অভিযানে নামব।’
এর আগে গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সভা করে সারা দেশের লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছায় বন্ধ করার আলটিমেটাম দেয়। গত শনিবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। আলটিমেটামের পাশাপাশি গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করতে অভিযান চালাচ্ছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় গতকালও অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সারা দেশে ৮৮২টি লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধের তথ্য এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। বন্ধের ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম সফল হওয়ায় তা আরও কিছুদিন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময় কর্র্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় তাদের অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করলে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াহবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
সারা দেশ বন্ধ ৮৮২, ঢাকা বিভাগে ১৬৭, রাজধানীতে ১২ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ৮৮২টি লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ হওয়ার তথ্য এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২২৯টি। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইনে বন্ধের তথ্য আসা অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে সন্ধ্যায় বন্ধ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৫০টি বলে জানিয়েছিল অধিদপ্তর। পরে রাতে এ সংখ্যা ৮৮২ বলে জানানো হয়। গতকাল পর্যন্ত বন্ধ হওয়া অবৈধ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১৬৭টি। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় অবৈধ প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে ১২টি।
দুই সিটি করপোরেশনে যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে চাঁনখারপুলের আইসিইউ স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরে কিডনি অ্যাওয়ার্নেস হাসপাতাল, যাত্রাবাড়ীতে বন্ধ হওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হেলথ কেয়ার রয়েছে। ধানমন্ডি এলাকায় হসপিস হেলথ কেয়ার, বারাক পিআরপি, ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে ধানমন্ডি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোবহানবাগের ইডব্লিউভিএএমের হাসপাতালের লাইসেন্স থাকলেও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেই। তারপরও তারা ডায়াগনসিস করছিল। সেটাও বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বনানীর ইয়র্ক হাসপাতাল ও বারিধারার ওয়াহাব মেডিকেল প্র্যাকটিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স না নেওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষ তথ্যমতে, তিন দিনের অভিযানে ঢাকায় ১৬৭টি, চট্টগ্রামে ২২৯টি, রাজশাহীতে ৭৮টি, রংপুরে ১৪টি, ময়মনসিংহে ৯৬টি, বরিশালে ৫৯টি, সিলেটে ৩৫টি এবং খুলনা বিভাগে ২০৪টি অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা হয়েছে।
অনলাইনে আবেদন করল আলোচিত ওয়াহাব মেডিকেল প্র্যাকটিস : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বারিধারার ওয়াহাব মেডিকেল প্র্যাকটিস নামে একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেই লাইসেন্স নেই। আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া যেতে হলে স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এসব দেশের এমবাসির তালিকাভুক্ত যেসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের মধ্যে এটি একটি। প্রতিষ্ঠানটির এসব আমেরিকা এমবাসির সঙ্গে চুক্তি আছে। এটা বন্ধ করতে গেলে এমবাসির অনুমোদন লাগবে। তাই তাদের লাইসেন্স না নেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ ওই প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে চিঠি দেওয়ার কথা রয়েছে।
অবশ্য প্রতিষ্ঠানটি গতকালই লাইসেন্সের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইনে আবেদন করেছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানেই না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। তারা ইতিমধ্যেই অনলাইনে আবেদন করে ফি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দিয়েছে। আজ (গতকাল) সারাদিন অধিদপ্তরে বসেছিল। আমরাও তাদের দ্রুত লাইসেন্স করে ফেলার জন্য বলেছি। কেউ যদি তার দোষ স্বীকার করে ও অনুমোদনের জন্য কাজ করে, তাহলে সেই সুযোগটুকু দেওয়া উচিত। কারণ আমাদের উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈধ করে নিয়ন্ত্রণে আনা, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা ও সরকারের রাজস্ব আয়। সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। মূল লক্ষ্য এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোকে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।’
লাইসেন্স ও অন্য সুযোগ-সুবিধাও নেই : অভিযানে বন্ধ করে দেওয়া হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নানা ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় দুটি টিম অভিযান চালিয়েছে। একটি টিম কাজ করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আশপাশে এবং আরেকটি টিম কাজ করেছে যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরে। যেগুলো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর লাইসেন্স নেই। তারা লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালনা করছে। কেউ কেউ শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালনা করছে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই লাইসেন্স না থাকায় স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা রবিবার থেকে অভিযান শুরু করেছি। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ছিল না। চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা, শয্যা ও যন্ত্রপাতি থাকার কথা, তা ছিল না। দুই-তিন দিনের মধ্যেই আমরা আরও কঠোর অভিযানে যাব। আমরা কিছু প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করার জন্য বলে এসেছি। যারা স্বেচ্ছায় বন্ধ করছে, সেটা ভালো। তারপরও আমরা অনুরোধ করেছি বন্ধ করার জন্য। বন্ধ না করলে আমরা বৈধ ও ইতিমধ্যেই বন্ধ করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা ধরে সাঁড়াশি অভিযানে নামব।’
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠানে রোগী আছে। সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করলে রোগীরা সমস্যায় পড়বে। আমাদের মূল লক্ষ্য মানুষের সেবা করা ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তাই এসব হাসপাতালকে রোগী অন্যত্র সরিয়ে বন্ধ করার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এসেছি। অভিযান চালাতে গিয়ে এখনো কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কারণ সারা দেশে একযোগে অভিযান চলছে। অনেকে ভয়ে গুটিয়ে ফেলেছে। আলাদা আলাদা করলে বাধা তৈরি করত। এখন সে সাহস পাচ্ছে না।’
আরও ৮৪ হাসপাতাল ও ক্লিনিক সিলগালা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রবিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত ৮৪টি অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি হাসপাতালকে জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য :
সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গতকাল তিনটি অনিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সিলগালা করা হয়েছে। খুলনা মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গতকাল অনিবন্ধিত ১৫টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সিলেট নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেট ও দরগাগেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি অনিবন্ধিত হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে।
এদিকে নীলফামারীতে পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে অনিবন্ধিত পাঁচটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। টাঙ্গাইল সদরে অভিযান চালিয়ে গতকাল পাঁচটি ক্লিনিক সিলগালা করা হয়েছে এবং একটিকে জরিমানা করা হয়েছে। মির্জাপুরে গতকাল পাঁচটি বেসরকারি ক্লিনিক সিলগালা ও তিনটি ক্লিনিককে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নেত্রকোনা পৌরশহরে গতকাল আটটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রাজবাড়ীতে অনুমোদনহীন আটটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করেছে প্রশাসন। পটুয়াখালীর বাউফলে ছয়টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করা হয়েছে। বগুড়া শহরে গতকাল অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় তিনটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করা হয়। চট্টগ্রামের সীতাকু-ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ ও দুটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। বাগেরহাটের মোংলায় নিবন্ধনবিহীন ও নবায়ন না থাকায় ১১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক সিলগালা এবং খাগড়াছড়ি সদর, মহালছড়ি ও মাটিরাঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা হয়েছে।