ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনে ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনের গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তারা বলছেন, চলমান সংকট চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বিঘিœত হবে। তাই সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে দ্রুত পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্যাম্পাসের পরিবেশ ঠিক রয়েছে। এই মুহূর্তে পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকার প্রয়োজন দেখছে না তারা।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে ডাকসু অকার্যকর হওয়ার পর মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনগুলোকে প্রতিহত করতে ও সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদাধিকার বলে এর প্রধান এবং ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ১৩টি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ পরিষদের সদস্য।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাস ত্যাগ করে ছাত্রদল। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনের আগে পরিবেশ পরিষদের সভার সিদ্ধান্তে ১০ বছর পর ফের ক্যাম্পাসে ফেরে ছাত্রদল। তারপর থেকে ক্যাম্পাসে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে আসছিল তারা। সর্বশেষ গত মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষ বাধে। এরপর থেকেই ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন। দুদিনের ওই সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের। তবে তাদের প্রবেশ ঠেকাতে ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখগুলোতে পাহারা দিতে দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের।
ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘ছাত্রদল নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করুক। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাব। কিন্তু তারা অছাত্র বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চাচ্ছে। আমরা তাদের বলব আপনারা নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে ক্যাম্পাসে আসুন। তবে তার আগে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করায় ক্ষমা চাইতে হবে।’
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হাসান রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে ফিরতে চাই কিন্তু ছাত্রলীগের বাধায় ক্যাম্পাসে যেতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর আমাদের অভিভাবক। তারা শুধু ছাত্রলীগের নয়, সবার অভিভাবক। ক্যাম্পাসে সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পরিবেশ পরিষদই পারে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে।’
এদিকে ছাত্রলীগ বিরোধী মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে বলে দাবি করেছে প্রগতিশীল কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। গত বৃহস্পতিবার প্রগতিশীল আট সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের নির্মম হামলা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভীতিকর ও অনিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ক্যাম্পাসে একটি সন্ত্রাসমুক্ত, নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য পরিবেশ পরিষদের কাজ করার কথা থাকলেও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় পরিষদটির অস্তিত্বের কথা শিক্ষার্থীরা ভুলতে বসেছে। তাই অবিলম্বে উপাচার্যকে পরিবেশ পরিষদের সভা আহ্বান করে ক্যাম্পাসে নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।’
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৯ সালের পর পরিবেশ পরিষদের তেমন কার্যকারিতা আমরা দেখছি না। যেহেতু ডাকসু নেই, এই মুহূর্তে পরিবেশ পরিষদ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষের পর থেকে ক্যাম্পাসে থমথমে। এ অবস্থায় পরিবেশ পরিষদের মিটিং করে এ বিষয়ে সুরাহা করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ছাত্রদলের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ছাত্রলীগ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হতে পরিবেশ পরিষদের সভা আহ্বান করা জরুরি।’
পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকা হবে কি না জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রাব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু স্বাভাবিক চলছে। যারা সমস্যা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাভাবিক রাখতে যা যা করণীয় তা আমরা করব।’ তবে এই মুহূর্তে পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকার পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি।