পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

দেশের প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানার শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা মে মাসেও পরিশোধ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বকেয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ৩১ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অবশ্য কিছু পোশাক কারখানায় এপ্রিলের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকার কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও পোশাক শিল্প মালিকরা তা অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি পোশাক কারখানায়ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বকেয়া নেই। কয়েকটি কারখানার এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া ছিল। সেসব কারখানা ঈদের আগেই বেতন-ভাতা পরিশোধ  করেছে।

তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রম অসন্তোষের পাশাপাশি বিদ্যমান বৈশি^ক পরিস্থিতিতে রপ্তানি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক তৈরি পোশাক শিল্পের বিদেশে ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকাসহ জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশে রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তা না হলে তৈরি পোশাক খাতে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী গার্মেন্টস ফ্রেবিক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জামের আমদানি সংকট, ক্রয়াদেশ কম পাওয়া বা না পাওয়া কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার কারণে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও সাব কন্ট্রাক্টের প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন বিঘিœত হওয়ায় কিছু কিছু তৈরি পোশাক কারখানা সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে শ্রমিকরা যেন তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ভাতাদি সঠিকভাবে সময়মতো পান, সে বিষয়টি নিশ্চিতে নজরদারি করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে বিষয়টি শ্রমিকদের আগেই জানানো এবং তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ভাতা পরিশোধ করেই কারখানা সরিয়ে নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকরা কোনো কারখানা বন্ধ করলে বা শ্রমিক ছাঁটাই করলে সেটা শ্রম আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে উল্লিখিত গার্মেন্টসগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।

কিছু কিছু গার্মেন্টস মালিক রপ্তানি হ্রাস, ক্রয়াদেশ বাতিল, ক্রয়াদেশ কম পাওয়া বা না পাওয়া, মূলধন স্বল্পতা, ঋণ ও প্রণোদনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতি মাসে সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ করেন না। অনেক সময় মালিকপক্ষ পূর্ব নোটিস ছাড়াই আকস্মিকভাবে কারখানা বন্ধ করে দেন। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে বিভিন্ন সময় কারণে-অকারণে শ্রমিক ছাঁটাই করে, ওভারটাইম ভাতা ও বার্ষিক ছুটির টাকা পরিশোধ করে না। কোনো কোনো কারখানায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী থাকে না, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মাঝেমধ্যে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরী, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী-গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট ৪ হাজার ৩৪৭টি পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৪৬টি কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের চলতি বছরের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতাদি মে মাসেও পরিশোধ করেনি। ফলে এসব কারখানায় যেকোনো সময় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা, বিদেশি ক্রয়াদেশ পেতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহারে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নীতিমালা তৈরি করার সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ রোধে রুগ্্ণ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র কারখানা চিহ্নিত করে আর্থিক, কারিগরি প্রণোদনাসহ সমস্যা সমাধানে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।