ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এমন নির্দেশনা দেন তিনি। সভায় সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ঢাবি) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করলে এ নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অংশ নেওয়া একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা নিয়ে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। ঢাবি ক্যাম্পাসসহ সারা দেশে প্রতিবাদের নামে ছাত্রলীগের মারামারির ঘটনার সমালোচনা করে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে একাধিক সদস্য বলেন, কাউকে সুযোগ দেওয়া যাবে না। সামনে জাতীয় নির্বাচন এ বিষয়টিকে মাথায় নিয়ে সবাইকে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ছাত্রলীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের লাগামহীন আচরণ থেকে বিরত থাকার কথা বলেন তারা। এসব শুনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাদেরও লাগাম টেনে ধরতে হবে। এছাড়া ছাত্রলীগ ইস্যুতে দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনাও করেন বৈঠকে উপস্থিত উপদেষ্টারা।
বৈঠকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ, সেখানেই সরকার থাকবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়” এই নীতি মেনে চলব। তবে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থই প্রাধান্য দেওয়া হবে।’ রাতে শেষ হওয়া বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, উপদেষ্টা পরিষদ দলের চিন্তাকোষ হিসেবে কাজ করবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দলের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেবে।
বৈঠকের শুরুতে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা সূচনা বক্তব্য দেন। এরপর নেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, বৈঠকে উপস্থিত উপদেষ্টা পরিষদের সব সদস্যই বক্তব্য রাখেন। দলীয় প্রধান সবার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং নিজের মত দেন। আলোচনার একটা বড় অংশ জুড়েই ছিল পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, খাদ্যপণ্যের মূল্য, দলের আগামী জাতীয় সম্মেলন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাপী নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি অনেক নেতা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের দেশে দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কার বিষয়টিও উঠে আসে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী হবে এসব বিষয়ে কথা বলেন নেতারা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ মৌসুমে খাদ্যশস্য ও শাকসবজির পর্যাপ্ত উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত অবস্থানে আছে। এরপরও বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধির কারণে যেসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেতে পারে, সেগুলোর বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।’
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এবং বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে দলকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দলে নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ করে দিতে হবে। জামায়াতের লোকজন যাতে টাকা-পয়সা দিয়ে দলে ঢুকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
সভায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের মর্যাদা বেড়ে গেছে বলে দাবি করেন উপদেষ্টারা। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সাহসিকতার জন্য উপদেষ্টা পরিষদের নেতারা তাকে ধন্যবাদ জানান।
আগামী ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বলেও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বৈঠকে জানান। এ লক্ষ্যে তৃণমূল থেকে দলকে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনও এরই মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি।
জনগণ পাশে ছিল বলেই পদ্মা সেতু হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়ে গেল। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা সংগ্রাম ও চাপ নিতে হয়েছে। জনগণ পাশে ছিল, জনগণের আশীর্বাদ ছিল বলেই পদ্মা সেতু। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি এ কথা বলেন।
একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সভাটি হয়। প্রায় দুই বছর পর একনেক সভায় সশরীরে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে তিনি গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে একনেক সভায় সভাপতিত্ব করতেন।
গতকাল একনেক সভায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীসহ নয়টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। অনুমোদিত নয়টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি নতুন এবং বাকিগুলো সংশোধিত প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়ে গেল। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা স্ট্রাগল ও চাপ নিয়ে একনেক সভায় খোলামেলা শেয়ার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণ পাশে ছিল, জনগণের আশীর্বাদ ছিল বলেই পদ্মা সেতু। দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক প্রতিকূলতা ছিল বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন যে, এই প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রচেষ্টা জোরদার হলে, সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকলে লাইন কেটে দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকলে তা সবাইকে পরিশোধ করতে হবে। পাওনা না দিলে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিল সরকারি-বেসরকারি সবাইকে দিতে হবে। সবাইকে অবশ্যই বিল পরিশোধ করতে হবে। প্রতিটি স্থলবন্দর আপগ্রেড করতে হবে। স্থলবন্দরগুলোতে আধুনিক স্থাপনা ও সিস্টেম বসাতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গ্রামীণ সড়কের টেকসই উন্নয়নে নানা দিকে নজর দিতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণ প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সভার কার্যক্রমে অংশ নেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মুখ্য সমন্বয়ক, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।