জার্মান প্রবাসী মীর রাকিব-উন নবীর স্বজনরা গত রোজার ঈদে রেমিট্যান্স তুলতে গিয়ে ১ ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮৮ টাকা করে পেয়েছিলেন। এর সঙ্গে পেয়েছিলেন আরও ২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রণোদনা। এক মাসের ব্যবধানে ডলারের দর বেড়ে ৯০ টাকায় পৌঁছে গেছে। ডলারের এই বর্ধিত দরের কারণেও মিলছে নগদ প্রণোদনা। সেই হিসেবে বর্তমানে দুই দিক থেকে প্রণোদনা পাওয়ার পরও বাড়ছে না প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)।
রোজার মাসে রেমিট্যান্স যাও বেড়েছিল, এর পরের মাস মে-তে আবার ভাটার টান। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী মে মাসে ১৮৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা। রেমিট্যান্সের এই অঙ্ক গত এপ্রিলে আসা রেমিট্যান্সের তুলনায় ১২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার বা ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। আর গত বছরের মে মাসের তুলনায় কমেছে ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলার বা ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছরের মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। চলতি বছরের এপ্রিলে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০১ কোটি ৮ লাখ ডলার।
সবমিলিয়ে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। অথচ এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। সেই হিসেবে গত ১১ মাসে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ১৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
এদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যের বর্ধিত মূল্য আমদানির চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই মূহূর্তে ডলার সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও রেমিট্যান্সের এই পড়তি অবস্থা নীতিনির্ধারকদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
গত ১ জানুয়ারি রেমিট্যান্সের নগদ প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, প্রণোদনা বাড়ানোর ফলে অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। তবে বর্তমানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অর্থবছরের বাকি এক মাসে রেমিট্যান্সের মোট অঙ্ক ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।
দুদিক থেকে প্রণোদনা পাওয়ার পরও রেমিট্যান্সের এই পড়তি অবস্থার কারণ সম্পর্কে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দর ব্যাংকের থেকে বেশি থাকায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে অনেকেই এই অবৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছে। তাছাড়া অনেক সময় বৈধ আয়ের বাইরে থাকা টাকা হুন্ডিতেই পাঠানো সহজ হয়। এ কারণেও হুন্ডি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ২৬ মে রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রতি ডলার ৮৯ দশমিক ৮০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব ব্যাংককেই এই হার মেনে চলতে হচ্ছে। এর ঠিক এক মাস আগে ডলারের দর ছিল ৮৮ টাকার কাছাকাছি। সেই হিসেবে কেবল দর বাড়ার ফলেই ১ ডলারে ২ টাকা বেশি পাচ্ছেন প্রবাসীদের স্বজনরা। এর ওপরে রয়েছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা। সেই হিসেবে রেমিট্যান্সের প্রকৃত প্রণোদনা প্রায় ৪ দশমিক ৮০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু বর্তমানে খোলাবাজারে ১ ডলার ১০০ টাকার কাছাকাছি। সেই জন্য হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকায় সেদিকেই প্রবাসীরা ধাবিত হচ্ছেন কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্ব মার্কেট ও ব্যাংকের মধ্যে ডলারের বিনিময় হারের মধ্যে এখনো বড় ধরনের পার্থক্য রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে রেমিট্যান্স অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে চলে যায় কি না।’
তবে এই মুহূর্তে রেমিট্যান্সের নগদ প্রণোদনা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার পক্ষে নন এই গবেষক। তিনি বলেন, সরকার আর কত দেবে। অর্থবছরে এই প্রণোদনা দিতে গিয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রণোদনা বাড়ালে বরাদ্দও বাড়াতে হবে।
সেক্ষেত্রে ডলারের দর আরও কিছুটা বাড়িয়ে বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। এর ফলে প্রকৃত প্রণোদনা বাড়বে এবং হুন্ডি কমে আসবে বলে মনে করেন এই গবেষক।
সম্প্রতি রেমিট্যান্সের প্রণোদনা সহজ করতে প্রবাসীদের আয়ের নথি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়েছে সরকার। তাছাড়া একক বিনিময়হার নির্ধারণসহ রেমিট্যান্স বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।