এক. আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহার ‘রূপকল্প ২০২০’-এ অঙ্গীকার করেছিল, প্রতি পরিবারে একটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। এরপর তারা টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু অঙ্গীকার পূরণ তো দূরের কথা, যে প্রবৃদ্ধির সূচক দেখিয়ে সরকার উন্নয়নকে দৃশ্যমান করতে চাইছে, বাস্তবে তা বন্ধ্যা বলে মনে হয়। উন্নয়নের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু সরকার প্রবৃদ্ধির আসক্তিতে আচ্ছন্ন। যেকোনো প্রক্রিয়ায় প্রবৃদ্ধির সূচক সংখ্যা পূরণে সরকারের যে চেষ্টা, তা কি ব্যর্থতা আড়ালে কৌশল? যে উন্নয়ন পরিকল্পনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, তা যতই চকচকে হোক না কেন, প্রকারান্তরে তার জোর কম। দেশের কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীকে কাজের বাইরে রেখে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে তাই বিশাল তরুণ ও যুব জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ।
করোনায় নতুন করে দারিদ্র্য বেড়েছে। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের দরিদ্র ও প্রতিবন্ধীসহ সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এখন জীবন-জীবিকার সংকটে। অর্থনৈতিক কার্যকলাপ স্তিমিত হওয়া বা মন্দার কারণে জনগণের চাকরির ক্ষতি হচ্ছে, নিয়মিত বেতন না পাওয়া, কম বেতন পাওয়া, বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেলায় এমনটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক মানুষ গ্রামে ফিরে গেছেন তাল মেলাতে না পেরে। চাকরির বাজার হ্রাস পাওয়া অনেক তরুণকে হতাশার মধ্যে ফেলেছে। চাকরি প্রত্যাশীদের এখন নয়া স্বাভাবিক পরিস্থিতি (নিও নরমাল সিচুয়েশন) নিয়ে তীব্র উদ্বেগসহ আলোচনা করে সময় কাটাতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.৯৯ শতাংশ। তবে যুবসমাজের বেকারত্বের হার ১১.৯ শতাংশ, জাতীয় গড়ের আড়াইগুণেরও বেশি। মোট বেকারত্বের মধ্যে বেকার যুবকদের সংখ্যা ৭৯.৬ শতাংশ। কিন্তু সরকার সেদিকে যথাযথ দৃষ্টি না দিয়ে প্রবৃদ্ধি সৃষ্টিতে আগ্রহী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, কর্মসংস্থান সমস্যা সমাধানে তা সাফল্য দেখাতে পারেনি।
দুই. অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ‘ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধান’ শীর্ষক একটি গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছেন। গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনার আঘাতে দেশের ৩ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। কর্মবাজারে যোগ্য প্রায় দেড় কোটি মানুষ আগের পেশায় ফিরতে পারেননি। তারা করোনার আগে কৃষি, শিল্প, সেবা, নির্মাণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজার প্রভৃতি খাতে কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। গবেষণাপত্রে আরও উঠে এসেছে কর্মহীন হওয়া মানুষের মধ্যে ৪০ শতাংশ তাদের আগের পেশায় ফিরতে পারবেন না, শ্রমবাজারের ধরনটাই পালটে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার গুরুত্ব ও উপযোগিতা বেড়েছে। সন্দেহ নেই, আবুল বারকাতের গবেষণাপত্রের তথ্যগুলো আমাদের মন খারাপ করে দেয়। এই মন খারাপ হওয়াটা আরও তীব্র হয়, যখন আমরা মূল্যস্ফীতি দেখতে পাই। এই যে বেকার হয়ে যাওয়া কিংবা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জিডিপির প্রবৃদ্ধির বদলে কর্মসংস্থান বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি রোধের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
তিন. ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট হবে ৫১তম বাজেট। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এতে মোট দেশজ ও উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে, ২০২০-২১ অর্থবছরের আকার ছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ছয় লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন বাজেটে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হচ্ছে। আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘কর্মসংস্থান নীতি-২০২২’ শিরোনামের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। সেই নীতির খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশের জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার ৮% এর বেশি হলেও কর্মের সুযোগ সৃষ্টির হার মাত্র ৩.৩২%। সিপিডি-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন, দেশে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এরকম প্রবৃদ্ধি আরও বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বৈষম্য থাকলে সমাজ টেকসই হয় না। জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ চাকরির বাজারের বাইরে থাকলে তাদের অবদান থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়। শুধু তারাই নয়, অর্থনীতিও বঞ্চিত হয়। কোনো না কোনো সময় গিয়ে সেই প্রবৃদ্ধি আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না।
বর্তমানে যে প্রবৃদ্ধি তা কর্মসংস্থানবান্ধব নয়। লাখ লাখ যুবক বর্তমানে চাকরিহারা, বেকাররা প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে ব্যবসায় বাণিজ্যে সংযুক্ত হতে পারছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগামী বাজেটসহ পরবর্তী বাজেটগুলোতে সুস্পষ্ট নজরদারি থাকা উচিত। বিদেশেও আমাদের কর্মসংস্থান বর্তমানে কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতি জোর দিতে হবে। এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থার তদারকি বাড়াতে হবে। ব্যাংকের কৃত্রিম আয় বন্ধ করে বিনিয়োগ আদায়ের হার বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতিবছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮.৪ লাখ এবং বৈদেশিক কর্মে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে।
চার. সরকারের কর্মসংস্থান নীতিমালায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে চায় সরকার। দেশের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। যুবকদের বেকারত্বের হার বেড়ে এখন হয়েছে ১০.৬%। জনসংখ্যার হিসাবে এই মুহূর্তে দেশে যুবশক্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তাদের সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শ্রমবাজারের সংকট নিয়ে পরামর্শটি হলো : ‘কর্মসংস্থান কমিশন’ গঠন। ওই কমিশন বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। তাছাড়া কমিশন স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কর্মপ্রত্যাশী যুবকদের নিবন্ধন নিশ্চিত করে, তাদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও চাহিদা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া এ কমিশন দেশে কর্মশক্তিকে ভবিষ্যতের যে কোনো পর্যায়ের জাতীয় এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে তুলতে পারে। নাহলে কর্মসংস্থান সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা অনলাইন জব রেজিস্ট্রেশন সেন্টারের দাবি জানিয়ে আসছি। খসড়া কর্মসংস্থান নীতিতে বলা হয়েছে, দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ কর্মসংস্থান কমিশনের লক্ষ্য হবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানসম্মত করা। দেশে থাকা হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পের প্রয়োজনমাফিক জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। দেশে কর্মক্ষম মানুষের জন্য ফরমাল সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ মাত্র ১৫ ভাগ। আর ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ মানুষ। জাতীয় অর্থনীতিতে এদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ফলে ইনফরমাল সেক্টরের কর্মক্ষেত্রে শোভন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করে তাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
পাঁচ. যুবকরা কাজ করতে চায়, আয় করতে চায়, দাঁড়াতে চায়। কাজ না পাওয়া থেকে যে হতাশা তৈরি হবে তা এই যুবকদের সৃজনশীলতা, কর্মউদ্যোগ, ভালো কিছু করার ইচ্ছা, সমাজের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা, প্রতিভা, সততা সব নষ্ট করে দেবে। এই ব্যাপক সংখ্যক জনশক্তিকে কাজ দিতে পারব না তখন এই শক্তি পরিণত হবে অভিশাপে। হতাশা থেকেই যুবশক্তি হয়ে যেতে পারে পথচ্যুত ও মাদকাসক্ত। ইতিমধ্যে এ পরিস্থিতির উপস্থিতি বেড়ে চলছে। এই যুবকদের কাজের পরিবেশের মধ্যে রাখার জন্য হতাশা থেকে মুক্তির জন্য কী করতে পারি? যুবকদের কাজের সুযোগ, শ্রমবাজার, বেকারত্ব, অভিবাসী শ্রমিক, নারী শ্রমিক, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পেশাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে। যুবকদের সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে, এবং দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার প্রভাবে আগামীতে কর্মসংস্থানের ধারণা পালটে যাবে। যেখানে গুরুত্ব বাড়বে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ। একটি গণমুখী এবং কর্মমুখী বাজেট প্রণয়ন করা জরুরি। আমরা সেই দাবিকেই সামনে নিয়ে আসতে চাই।
‘কর্মসংস্থান’ নামে আলাদা কোনো খাত নেই বাজেটে। কর্মসংস্থানের সংকট সমাধানের জন্য ঘুষ ছাড়া চাকরি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য বন্ধ ও সহজ শর্তে ঋণের নিশ্চয়তাসহ আসন্ন বাজেটে কর্মসংস্থান খাতে পৃথক বরাদ্দ দেওয়ার আহ্বান রাখছি। আসন্ন বাজেটে কর্মসংস্থানমুখী, যুববান্ধব বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেখতে চাই। যদি এখনই যুবকদের অবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ও দ্রুত উদ্যোগ না নেওয়া যায়, তাহলে এই বিপর্যয়ের দায় দশক ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। বেকারত্বের অভিশাপ দেখতে চাই না, আমরা যুবকদের হতাশ দেখতে চাই না, যুবকদের উদ্যোগী হিসেবে দেখতে চাই। যাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে না, কিন্তু কর্মে ইচ্ছুক তাদের জন্য বেকার ভাতা চালু করা যেতে পারে।
লেখক সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন