রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যার সন্দেহভাজন অন্যতম পরিকল্পনাকারী সুমন শিকদার ওরফে মুসাকে আটক করেছে ওমানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ১৭ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী দুবাই থেকে ওমানে যাওয়ার পরপরই তাকে আটক করা হয়। এরপর থেকেই মুসাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরোর (এনসিবি) কর্মকর্তারা ওমানের এনসিবির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। গতকাল শুক্রবার পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম ওমানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে তারা শিগগিরই মুসাকে নিয়ে দেশে ফিরবেন।’
এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সিস্টেমও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। কাজেই আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের নিয়মের মধ্যে থেকে এনসিবি টু এনসিবির সুসম্পর্কের ভিত্তিতেই তাকে (মুসা) দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নেওয়া হবে।’
মুসা দুবাই থেকে ওমানে যাওয়ার আগেই দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য সরবরাহ করা হয় জানিয়ে মহিউল বলেন, ‘তারাও (ওমানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।’
এনসিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, মুসাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. শাহিদুর রহমান রিপনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল ৬ জুন ওমানে যাবে। দলটির অন্য দুই সদস্য হলেন ডিবির মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার রফিকুল ইসলাম ও এনসিবির সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফয়েজউদ্দিন। দলটি ৮ জুনের মধ্যে মুসাকে নিয়ে দেশে ফিরতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, মুসার বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় একটি ও পল্লবী থানায় ১০টি মামলা রয়েছে। সে গত ১২ মার্চ দেশ থেকে পালিয়ে দুবাই যায়।
মুসা আটকের খবরে টিপুর স্ত্রীর স্বস্তি : ওমানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মুসা আটক হওয়ার খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রী ও হত্যা মামলার বাদী ফারহানা ইসলাম ডলি। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি একজন বিধবা নারী হিসেবে ওমান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, তারা যেন আমার স্বামী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এ মুসাকে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে দেন। তাকে ফিরিয়ে আনতে পারলে, আমার স্বামী হত্যাকাণ্ডে জড়িত মদদদাতা, আশ্রয়-প্রশ্রয়কারী ও অর্থ সরবরাহকারী সবার মুখোশ উন্মোচিত হবে। ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারা আমার বিষয়টি নিয়েই কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের ওপর আমার আস্থা আছে।’
গত ২৪ মার্চ রাত ১০টার দিকে শাহজাহানপুরের আমতলা এলাকায় অস্ত্রধারীর গুলিতে নিহত হন গাড়িতে থাকা মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক টিপু। এ সময় একই অস্ত্রধারীর ছোড়া এলোপাতাড়ি গুলিতে আরও নিহত হন টিপুর গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা ২৪ বছর বয়সী কলেজছাত্রী প্রীতি। এ ঘটনায় পরদিন টিপুর স্ত্রী ডলি শাহজাহানপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলার পর ২৬ মার্চ রাতে বগুড়া থেকে শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করে ডিবির মতিঝিল বিভাগ। পরে তার দেওয়া তথ্যে আবৃত্তিকার আহকাম উল্লার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা এরফান উল্লাহ দামালকে গ্রেপ্তার করা হয়। টিপু হত্যার এক সপ্তাহ পর র্যাব এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে রাজধানীর মতিঝিল থানার ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার ওরফে শ্যুটার সালেহ (৩৮), নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির (৩৮) এবং মোরশেদুল আলম ওরফে কাইলা পলাশকে (৫১) গ্রেপ্তার করে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে তারা হত্যাকা-ের ঠিক পরদিনই কিলার আকাশের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হন। জয়পুরহাট সীমান্ত পার হতে ব্যর্থ হয়ে বগুড়া ফিরে গেলে তিনি গ্রেপ্তার হন। তবে তার কাছ থেকে শুধু সুমন শিকদার ওরফে মুসার নাম ছাড়া আর কোনো তথ্য বের করতে পারেননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। অস্ত্র সরবরাহকারীর নামও অজানা রয়ে গেছে। তবে তাদের ধারণা, আরও দুটো ব্যাকআপ টিম ছিল কিলিং মিশনে।
তদন্তকারী দলের সুপারভাইজার (তত্ত্বাবধায়ক) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রিফাত রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিপু হত্যাকাণ্ডের প্রধান শ্যুটার আকাশ স্বীকার করেছে যে তার সঙ্গে শুধু মুসার কথা হতো। তার নির্দেশেই সে কাজটি করেছে। তবে এর ওপরে কারা রয়েছে সে সম্পর্কে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মুসাকে পাওয়া গেলে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা সহজ হবে।’
এর আগে র্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, টিপু হত্যার পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম একজন হলো মুসা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে জড়িত অন্যদের নামও বেরিয়ে আসবে। ঘটনার তিন থেকে চার মাস আগে টিপু হত্যার পরিকল্পনা হয়। পুরো হত্যা মিশনের নেপথ্যে কাজ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ-প্রকাশের অন্যতম শ্যুটার ও বোচা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সুমন শিকদার ওরফে মুসার সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করেন ওমর ফারুক। প্রাথমিকভাবে দেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। টাকার বড় একটি অংশের জোগান দেন ওমর ফারুক। হত্যাকাণ্ডের ঠিক ১২ দিন আগে সবকিছু ঠিক করে ১২ মার্চ দুবাইয়ে চলে যায় মুসা।